রাজশাহীতে ছুটির দিনেও উৎসবমুখর পরিবেশে প্রচারণা

166

স্টাফ রিপোর্টার : ভোটের দিন যতোই এগিয়ে আসছে ততোই জমে উঠছে ভোটের মাঠ। শুধু শহর নয়। গ্রামে গ্রামে, পাড়া-মহল্লায় ছড়িয়ে পড়েছে নির্বাচনী উত্তাপ। চায়ের স্টলে, হাট-বাজারে বাজছে ভোটের বাজনা। ছেয়ে গেছে পোস্টারে পোস্টোরে। চলছে মাইকে প্রচারণাও। নানা গানে, নানা তালে ভোটারদের মন জয় করার চেষ্টা চলছে। গতকাল শুক্রবার ছুটির দিনেও রাজশাহী মহানগরীসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় নির্বাচনী প্রচারণায় কোনো কমতি ছিল না। সর্বত্র উৎসবমুখর পরিবেশে প্রচারণা চালান বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা। বিশেষ করে ১৪ দল মনোনীত ও মহাজোট সমর্থিত নৌকা প্রতীকের প্রার্থী এবং জাতীয় ঐক্যফ্রণ্ট মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীদের প্রচারণায় ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। এই দুইটি প্রতীকের প্রচারণায় সর্বস্তরের মানুষের বেশি আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে।
নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় আওয়ামী লীগসহ মহাজোট ও বিএনপিসহ ঐক্যফন্টের নিজ নিজ দলের নেতাকর্মীরা দীর্ঘদিনের জমে থাকা বিভেদ ভুলে এক সঙ্গে মিলিত হতে শুরু করেছে জোরে সরে। এতে ভোটের মাঠ আরো বেশি জমে উঠছে।
ফজলে হোসেন বাদশা : আসন্ন একাদশ সংসদ নির্বাচনে রাজশাহী-২ (সদর) আসনে ১৪ দল মনোনীত প্রার্থী ফজলে হোসেন বাদশা বলেছেন, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার আগে তিনি যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তার সবই পূরণ করেছেন। গত ১০ বছরে রাজশাহী মহানগরীতে অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে। উন্নয়নের এই ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে এবারও সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতিকে ভোট দিতে হবে। গতকাল শুক্রবার বিকালে নগরীর ২ নম্বর ওয়ার্ডের কড়াইতলা মোড়ে এক সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্দেশ্যে বলেন, ১০ বছর আগে ২ নম্বর ওয়ার্ড গ্রাম ছিল। এখন সেটা শহর হয়ে গেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এমন উন্নয়ন ধরে রাখতে চাইলে নৌকায় ভোট দিন। তিনি বলেন, আজকে যারা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেখিয়ে অন্য প্রতিকে ভোট চাইতে আসছেন তারা ১৯ বছর এ শহরের সংসদ সদস্য ছিলেন, মেয়র ছিলেন। তারা কি করেছেন এ এলাকার জন্য? কিছুই করেননি। আবার তাদের সংসদ সদস্য বানালে আকাশে পাখির মতো উড়ে যাবে। খুঁজে পাওয়া যাবে না। একটা অস্বাভাবিক পরিস্থিতির তৈরি হবে। কিন্তু এটা হতে দেয়া যাবে না। শহরে যে পরিবর্তনের ধারা সৃষ্টি হয়েছে তা ধরে রাখতে হবে। এ জন্য নৌকার বিকল্প নেই। রাজশাহী সদরের টানা দুই মেয়াদের এই সংসদ সদস্য বলেন, রাজশাহী ১৪ দলের সমন্বয়ক এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন মেয়র হয়েছেন। আমি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হতে পারলে দুজনে মিলে অনেক বড় বড় প্রকল্প আনব। আমাদের রাজশাহী এগিয়ে যাবে। এ জন্য আমাকে সুযোগ দেবেন। আগের প্রতিশ্রুতি যেভাবে রক্ষা করেছি, এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না। সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন মহানগর ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি লিয়াকত আলী লিকু। উপস্থিত ছিলেন সাধারণ সম্পাদক দেবাশীষ প্রামানিক দেবু, ওয়ার্ড কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম, ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি সেলিম রেজা, ওয়ার্ড ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ইসহাক আলী, সাধারণ সম্পাদক গোলাম রসুল বাবলু, হড়গ্রাম মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মারুফ হোসেন প্রমুখ। শ্রমিক ফেডারেশনের নেতা আকবর আলী লালু সভায় সভাপতিত্ব করেন। সভা শেষে তারা ২ নম্বর ওয়ার্ডের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় নৌকা প্রতিকের পক্ষে প্রচার চালান। ফজলে হোসেন বাদশাও এলাকার বাসিন্দাদের হাতে হাতে নৌকা প্রতিকের লিফলেট তুলে দিয়ে ভোট প্রার্থনা করেন।
রাজশাহী ১৪ দলের সভা : আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে রাজশাহী ১৪ দলের সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শুক্রবার রাতে রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন রাজশাহী ১৪ দলের সমন্বয়ক এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন। সভায় রাজশাহী-২ (সদর) আসনে ১৪ দল মনোনীত ও মহাজোট সমর্থিত প্রার্থী ফজলে হোসেন বাদশাও উপস্থিত ছিলেন।
সভায় মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সিটি মেয়র খায়রুজ্জামান লিটন নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন। বলেন, রাজশাহীতে নৌকার জোয়ার উঠেছে। এ জন্য সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নৌকা বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছে। এই ভোটগুলো হারিয়ে যায়নি। তবে নগরীর ৩ লাখ ১৮ হাজার ভোটারের কাছেই ভোট চাইতে হবে। এমন লক্ষ্য নিয়েই ১৪ দলের নেতাকর্মীদের কাজ করতে হবে। এভাবে কাজ করতে পারলে নৌকার বিজয় নিশ্চিত।
সভায় বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও রাজশাহী সদরের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, রাজশাহীর ১৪ দল যেভাবে ঐক্যবদ্ধ রয়েছে তাতে এই নির্বাচনে নৌকার বিজয় ত্বরান্বিত হয়েছে। আমরা আগামী ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত এভাবে মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাইব। ভোটাররা উন্নয়নের কথা চিন্তা করেই আমাদের নির্বাচিত করবেন।
সভায় মহানগর ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি লিয়াকত আলী লিকু, মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার, সহ-সভাপতি শফিকুর রহমান বাদশা, মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী কামাল, নওশের আলী, নিঘাত পারভিন, সাংগঠনিক সম্পাদক আসলাম সরকার, ক্রীড়া সম্পাদক মীর তৌফিক আলী ভাদু, মহানগর জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান ডালিম প্রমুখ। এছাড়া সভায় জাসদের জেলা সভাপতি মজিবুল হক বকু, নগর সভাপতি প্রদীপ মৃধা, বাংলাদেশ জাসদের নগর সম্পাদক শফিকুল ইসলাম শফিক, মহানগর আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্য সম্পাদক ওমর শরীফ রাজুম, উপ-প্রচার সম্পাদক মীর ইসতিয়াক লিমন, উপ-দপ্তর সম্পাদক শফিকুল ইসলাম দোলন, সদস্য আহসানুল হক পিন্টু, এনামুল হক কলিন্সসহ ১৪ দলের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
মিজানুর রহমান মিনু : রাজশাহী-২ (সদর) আসনে জাতীয় ঐক্যফ্রণ্ট মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মিজানুর রহমান মিনু বলেছেন, বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করার জন্য এই নির্বাচনে বিএনপি, ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট অংশ গ্রহণ করেছে। তিনি বলেন, যত বাধাই আসুক না কেন বিএনপি জোট নির্বাচন বর্জন করবে না। আর এই নির্বাচনে বিএনপি জোট তথা ধানের শীষ প্রতীকের বিজয় কেউ ঠেকাতে পারবে না। গতকাল শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে নগরীর ২ নং ওয়ার্ডে গণসংযোগকালে ভোটার ও সাধারণ জনগণের উদ্দেশ্যে তিনি এসব কথা বলেন। এরআগে মিজানুর রহমান মিনু গতকাল রাজপাড়া থানা বিএনপি কার্যালয় থেকে গণসংযোগ শুরু করেন।
এদিকে, বিএনপি নেতা মিনু নেতাকর্মী ও সমর্থকদের নিয়ে ২নং ওয়ার্ডের প্রতিটি পাড়া ও মহল্লায় যান। এসময় চারিদিকে উৎসবে পরিণত হয়। নেতাকর্মী ও সমর্থকদের পদচারনায় সে সময়ে এলাকা মুখরিত হয়ে উঠে। এসময় মিনুর সাথে ছিলেন মহানগর বিএনপির সহ-সভাপতি নজরুল হুদা, রাজপাড়া থানা বিএনপির সভাপতি শওকত আলী, সাধারণ সম্পাদক আলী হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক মুরাদ পারভেজ পিন্টু, ৬নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি গোলাম নবী গোলাপ, ৩নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ওয়াজির নাজির, ২ নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আবু সাইদ টুকু, মহানগর যুবদলের সাবেক সভাপতি ও বিএনপি নেতা ওয়ালিউল হক রানা, ১নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি শহীদ আলম প্রমুখ।
শাহরিয়ার আলম : গতকাল শুক্রবার দিনব্যাপী নৌকা প্রতিকের পক্ষে গণসংযোগ করেন রাজশাহী-৬ আসন থেকে পরপর দুইবার নির্বাচিত এমপি, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও নৌকা প্রতীকের প্রার্থী শাহরিয়ার আলম। প্রচারণাকালে প্রার্থীকে কাছে পেয়ে অত্যন্ত আনন্দিত হন ভোটাররা। বাঘার মশিদপুর গ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা আবুল হোসেন মারা যাওয়ার খবর পেয়ে শুক্রবার বেলা ১২ টায় তার পরিবারের সাথে দেখা করে সমবেদনা জানান শাহরিয়ার আলম। এরপর তিনি গড়গড়ি ইউনিয়নের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে গিয়ে জনগণের সাথে সাক্ষাত করে নৌকা প্রতিকে ভোট চাওয়াসহ দোয়া প্রার্থনা করেন। এসময় তার সাথে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম বাবুলসহ গড়গড়ি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি শওকত হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক রুহুল আমিনসহ আরো অনেকে।
গণসংযোগ কালে ভোটারদের উদ্দেশে শাহরিয়ার বলেন, আমি যদি এলাকার উন্নয়ন করে থাকি তাহলে আপনারা আমাকে আরেকবার ক্ষমতায় আসার সুযোগ করে দিবেন। যাতে করে আমি আমার অসম্পূর্ণ কাজগুলো সম্পন্ন করতে পারি। আমার বিশ্বাস আপনারা গত ১০ বছরে চারঘাট-বাঘায় যে পরিমাণ উন্নয়ন দেখেছেন তা অতীতে হয়নি। এই উন্নয়নের কৃতিত্ব নৌকার। সেটি বিবেচনা করে আপনারা আপনাদের মূল্যবান রায় দিবেন এবং দেশের উন্নয়ন ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখবেন।
এরপর বাদ মাগরিব প্রতিমন্ত্রী ওই ইউনিয়নের সুলতানপুর গ্রামে আয়োজিত এক সমাবেশে বক্তব্য রাখেন। সেখানে শাহরিয়ার বলেন, হাতে বেশি সময় নেই। আর মাত্র ১৪ দিন পর নির্বাচন। এই নির্বাচন অত্যন্ত চ্যালেঞ্জমুখর নির্বাচন। ইতোমধ্যে কেন্দ্র ভিত্তিক কমিটি করে আপনাদের নির্বাচন সংক্রান্ত সুপরামর্শ দেয়া হয়েছে। আপনারা দয়া করে এক কেন্দ্রের মানুষ আরেক কেন্দ্রে গিয়ে প্রচারনা চালাবেন না। প্রচারনা চালাবেন নিজ নিজ কেন্দ্র এলাকায়।
শফিকুল হক মিলন : পবা উপজেলার হড়গ্রাম ইউপিতে বৃহস্পতিবার মহানগর বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক শফিকুল হক মিলন দিনব্যাপি গণসংযোগ করেন। তিনি সকাল ৯টায় কাশিয়াডাঙ্গা মোড় থেকে শুরু করে ইউনিয়নের সকল গ্রাম এবং পাড়ায় যান এবং ধানের শীষের জন্য ভোট প্রার্থনা করেন। গণসংযোগ শুরুর মিলন বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি, জনগণের স্বাধীনতা, খুন, গুম, নির্যাতন ও গায়েবী মামলা থেকে মুক্ত করতে এই নির্বাচনে বিএনপি, ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে অংশ গ্রহন করেছে। কিন্তু সরকারী দল নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে।

SHARE