খামোশ বললেই মানুষের মুখ খামোশ হবে না: প্রধানমন্ত্রী

166

গণধ্বনি ডেস্ক :প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট যুদ্ধাপরাধী ও যুদ্ধাপরাধী পরিবারের স্বজন, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার আসামিদের স্বজন, দুর্নীতিবাজ ও তাদের স্বজন এবং বাংলা ভাই ও জঙ্গিবাদের পৃষ্ঠপোষকদের মনোনয়ন দিয়েছে। এই অপরাধীরা যেন ভোট না পায়। এ বিষয়ে দেশের জনগণকে সচেতন থাকতে বলবো।’

গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের কঠোর সমালোচনা করে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেছেন, ‘ড. কামাল, সুলতান মনসুর, কাদের সিদ্দিকী ও মান্নারা এত আবেগ দিয়ে জ্ঞানগর্ভ কথাবার্তা বলেন। এত আবেগ দিয়ে লেখা, এত বিবেক! কোথায় গেল সেই বিবেক? ওই ধানের শীষেই তো তারা নির্বাচন করছেন। কীভাবে তারা অপরাধীদের সঙ্গে হাত মেলান? তবে তাদের লজ্জা একটু কম লাগে বলে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে খামোশ বলতে পারেন। তবে খামোশ বললেই মানুষের মুখ খামোশ হবে না, জনগণ চুপ হবে না।’

শুক্রবার রাজধানীর খামারবাড়ি কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘স্বাধীনতার পর জাতির পিতা যে সংবিধান প্রণয়ন করেছিলেন, তাদের যুদ্ধাপরাধীদের সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার কোনো অধিকার ছিল না। অথচ যারা মানবতাবিরোধী অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত, আজ আমরা দেখি তাদের পরিবারের সদস্যদের বিএনপিসহ যে ঐক্য করা হয়েছে, তাতে তাদেরও মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।’

দেশবাসীর উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, এই অপরাধীরা যেন আর কখনো নির্বাচিত হতে না পারেন। যেসব অঞ্চলে এরা দঁড়িয়েছেন, তাদের চিহ্নিত করুন। সম্পূর্ণভাবে এদের বয়কট করুন। মনে রাখতে হবে, এরা ক্ষমতায় আসলে এদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে, এদেশের অগ্রগতি ব্যাহত হবে, এদেশের ভাগ্য গড়ার জন্য আজকে যে অর্থনৈতিক উন্নয়নটা হচ্ছে সেটাও থেমে যাবে।’

জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ও মতিউর রহমান নিজামীসহ মানবতাবিরোধী অপরাধে সাজাপ্রাপ্তদের স্বজনদের সঙ্গে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তাদের কাছে আমার প্রশ্ন— যারা এত বড় অপরাধ করলো, আর যে পাকিস্তানি বাহিনীকে আমরা পরাজিত করলাম, তাদের এই দোসরদের কীভাবে ধানের শীষে মনোনয়ন দেওয়া হলো? আর যারা আমাদের সঙ্গে ছিলেন, এখন বিএনপি জোটের সঙ্গে চলে গেলেন— তারা এই ধানের শীষ নিয়ে একই সঙ্গে কীভাবে নির্বাচন করবেন? এ প্রশ্নের জবাব তারা জাতির কাছে দিতে পারবেন কি-না?’

তিনি বলেন, যারা বিএনপির সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন, কামাল হোসেনরা… তারা এই লজ্জাটা কোথায় রাখবেন— আমার এটাই প্রশ্ন। ওদের অনেকে আবার পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই’-এর সঙ্গেও না-কি কথা বলছেন? তারা আসলে কী চান? আর এদের সঙ্গে যারা হাত মিলিয়েছেন তারা কি লজ্জা পান? না-কি পান না? তবে তাদের লাজ-লজ্জা কম আছে। একজন (সাংবাদিক) প্রশ্ন করতেই তাকে খামোশ বলে দিলেন… খামোশ (চুপ) বললেই কি মানুষের মুখ খামোশ হয়ে যাবে? খামোশ বললে মানুষের মুখ খামোশ হবে না, মানুষকে খামোশ রাখা যাবে না।’

এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, যারা এত বড় বড় কথা বললেন সেই কামাল হোসেন, সুলতান মোহাম্মদ মনসুর… কাদের সিদ্দিকী তো তার মেয়েকেও ধানের শীষ দিয়ে ইলেকশনে। আমাদের মান্না এত তাত্ত্বিক লেখা, এত সুন্দর সুন্দর কথা, এত জ্ঞানগর্ভ কথা বলেন, কোথায় গেল সেই বিবেক? তাদের সেই বিবেকটা গেল কোথায়? যারা আজকে তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন, ওই ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচনে রয়েছেন, তারা রাজনীতিকে কোথায় নামিয়েছেন? মনে হয় রাজনীতিকে অপরাধী জগতের রাজনীতিতে পরিণত করেছেন। রাজনীতি হবে মানুষের কল্যাণে, দেশের মঙ্গল ও উন্নয়নের জন্য। আজ সেখানে এই অপরাধীরা যদি ক্ষমতায় এসে যায় তাহলে দেশের ভাগ্যে কী ঘটবে?’

বক্তব্যের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, ‘পাকিস্তানি সেনা ও তার দোসরদের লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশে কোন বুদ্ধিজীবী ও জ্ঞানী-গুনী মানুষ থাকবেন না, যারা দেশটাকে পরবর্তী সময়ে চালাতে সাহায্য করতে পারেন। সেই লক্ষ্য নিয়েই বেছে বেছে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা শুরু করেছিল তারা। আর ঠিক যেই মুহূর্তে তারা মনে করলো পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পতনটা অবশ্যম্ভাবী, আর তাদের সময় নেই, সেই সময় তারা বুদ্ধিজীবী হত্যা শুরু করে দেয়। আমরা তাদের সবার আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।’

তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু বিশেষ ট্রাইব্যুনাল করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে জেনারেল জিয়া যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তি দিয়ে তাদের রাজনীতিতে পুনর্বাসন করেন। আইয়ুব খান আমল থেকেই দেখা, অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী সামরিক স্বৈরাচাররা ক্ষমতা দখলে রাখার জন্য একটি দল গঠন করে। ক্ষমতা টিকে থাকতে প্রহসনের নির্বাচনও করে। বাংলাদেশেও জেনারেল জিয়াউর রহমানও ঠিক এই কাজই করেছিলেন। তিনি ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘খুনি মোশতাকই জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। এরপর জিয়া ক্ষমতা দখল করে নিজেকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা দেন। পরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করে দিয়ে সব সাজাপ্রাপ্ত অপরাধীদের ছেড়ে দেন। বিভিন্ন অঞ্চলে অঞ্চলে যারা খুনের আসামি— জিয়াউর রহমান তাদের ছেড়ে দিয়ে নিজের দলে নিয়ে আসেন। তাদের রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তার এলাকায় একদিনে প্রায় দেড়শ মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করেছিলেন জিয়াউর রহমান। অর্থাৎ যুদ্ধাপরাধীরাই ছিল তার আপনজন। তাদেরকেই তিনি ক্ষমতায় বসিয়েছিলেন। তাদের মন্ত্রী-উপদেষ্টা বানিয়ে রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।’

টানা দুই মেয়াদের আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ভোটারদের সামনে তুলে ধরার জন্য নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের আমলে সারাবিশ্বে এখন বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল। সরকারের এসব উন্নয়নের কথা ভোটারদের সামনে তুলে ধরে নৌকা মার্কায় ভোট চাইতে হবে।

সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, বি এম মোজাম্মেল হক, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য পারভীন জামান কল্পনা, ঢাকা মহানগর উত্তরের সাধারণ সম্পাদক সাদেক খান, দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ, শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. আলীম চৌধুরীর মেয়ে ডা. নুজহাত চৌধুরী, শহীদ বুদ্ধিজীবী শহিদুল্লাহ কায়সারের মেয়ে শমী কায়সার প্রমুখ। সভা পরিচালনা করেন দলের উপ-প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন।

SHARE