প্রতিদিন আমের বিক্রি ৬ কোটি টাকা

13

অনলাইন ডেস্ক : কাঠফাটা রোদে ভ্যানে করে আম নিয়ে এসে বিক্রি করছেন ৭০ বছর বয়সী আবদুল লতিফ। তিনি এসেছেন বাঘা উপজেলার বাজুবাঘা গ্রাম থেকে। নিজের তিনটা গাছে আমের ফলন এসেছিল। এর মধ্যে রয়েছে ক্ষীরসাপাত ও ল্যাংড়া আম। বেশি দামে বিক্রি করার জন্য আশা নিয়ে এসেছিলেন রাজশাহীর সর্ববৃহৎ আমের হাট বানেশ্বরে।

আবদুল লতিফ জানান, খুব ভোরে মানুষ নিয়ে গাছ থেকে আম নামানো হয়েছে। সেখান থেকে ভ্যানে করে বানেশ্বর হাটে এসেছেন আম বিক্রির জন্য। তিনটা গাছে প্রায় ২৫ মণ আম হয়েছে। প্রতিদিন পাঁচ থেকে সাত মণ নামিয়ে নিয়ে হাটে বিক্রি করছেন। দামও ভালো পাচ্ছেন বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, ক্ষীরসাপাত আম ৩ হাজার থেকে ৩২০০ টাকা মণ ও ল্যাংড়া আম ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত দুই বছর করোনার কারণে আমের দাম না পেলেও এ বছরের আমের দাম বেশি পাওয়া যাচ্ছে। গতবারের তুলনায় এবার লাভ বেশিই হচ্ছে।

রাজশাহীর বানেশ্বর হাটে আবদুল লতিফের মতো কয়েক হাজার আমচাষি ও ব্যবসায়ী আছে। প্রতিদিন বাঘা, চারঘাট, পুঠিয়া, দুর্গাপুর, বাগমারা, পবা নাটোরের বাগাতিপাড়া, লালপুর থেকে আমচাষি, বাগান মালিক ও ব্যবসায়ীরা এখানে আম কেনাবেচা করতে আসছেন। এই হাট থেকেই প্রতিদিন বিক্রি আমের বিকিকিনি হচ্ছে প্রায় ৫ কোটি টাকার। এছাড়াও রাজশাহীর নগরীসহ বিভিন্ন উপজেলার হাট-বাজারের আড়ত ও দোকানে বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১ কোটির টাকার আম।

তবে আমের ক্রেতারা জানাচ্ছেন, কয়েক বছরের তুলনায় এবার চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে আম। গত দুই বছরে গোপালভোগ ছিল মণপ্রতি ১২শ’ থেকে ১৬শ’ টাকার মধ্যে। ক্ষীরসাপাত ও ল্যাংড়া আমও ছিল তাই। কিন্তু এবছর শুরু থেকেই আমের দাম দ্বিগুন করে বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, করোনাভাইরাসের কারণে গেল দুইবছরে আমের ব্যবসা খুব খারাপ গেছে। এইবার আমের ফলনও হয়েছে কম। তাই ক্ষতি পুষিয়ে নেবার কারণে আমের দাম বেশি।

বানেশ্বর হাট ও রাজশাহী শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, গুটি জাতীয় আমের দাম অন্য আমের চেয়ে অনেক কম। এ আম বিক্রি হচ্ছে মণপ্রতি ১ হাজার থেকে ১২শ’ টাকায়। গোপালভোগ প্রায় শেষের পথে। তাই তার দাম এখন অনেক বেশি। ব্যবসায়ীরা বিক্রি করছেন ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার টাকায়। ক্ষীরসাপাত ও ল্যাংড়া বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার ৬০০ থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত। লক্ষণভোগ প্রতিমণ ৭০০ থেকে ৯৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া দুধস্বর, কালুয়াসহ কয়েক প্রজাতি আম ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিখ্যাত ফজলি ও আম্রপালি আম আসবে ১৫ জুন থেকে।

বানেশ্বর বাজারের স্থানীয় আড়ৎদার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বানেশ্বরের আমের আড়ৎগুলোতে প্রতিদিন কয়েক হাজার ক্রেতা আসছেন। আমাদের এখানে গাছ থেকে নাহলে হাট থেকে আম কিনে নিয়ে এসে বিক্রি করছি। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকার আড়ৎদার ও ব্যবসায়ীরা আমাদের কাছে আম কিনছেন। এই আমগুলো ট্রাক নাহলে কুরিয়ারে পাঠানো হচ্ছে। প্রতিদিন এই বাজার থেকে প্রায় ১০০ ট্রাক দেশের বিভিন্ন স্থানে আম নিয়ে যাচ্ছে।’

প্রতিদিন ভোর থেকে চলছে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলছে বানেশ্বর হাটে চলছে আমের বেচাকেনা। ক্রেতা-বিক্রেতাদের ভিড়ে বানেশ্বর এখন গত কয়েক বছরের চেয়ে অনেক বেশি সরগরম। রাজধানীসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহর থেকেও ক্রেতারা আসছেন আম কিনতে। ক্রেতা-বিক্রেতা আড়ৎদাররা বলছেন, বানেশ্বরসহ প্রতিদিন রাজশাহীতে প্রায় ৬ কোটি টাকার আমের ব্যবসা হচ্ছে। একই কথা বলছেন বিভিন্ন ব্যাংক কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, বছরের অন্য সময়ের তুলনায় এ মাসে লেনদেন অনেক বেড়েছে। বানেশ্বর বাজারের বিভিন্ন ব্যাংক, এজেন্ট ব্যাংকিং ও মোবাইল ব্যাংকিংও আগের তুলনায় লেনদেন কয়েকগুন বেশি হচ্ছে।

বানেশ্বর বাজারের বেসরকারি একটি ব্যাংকের কর্মকর্তা হাসান মাহমুদ বলেন, ‘পুঠিয়া উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বড় বাজার হচ্ছে বানেশ্বর। এখানে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে আমের মৌসুমে লেনদেন কয়েকগুন বেড়ে যায়। এবারও তাই হয়েছে। প্রতিদিন আমাদের ব্যাংকে ৫ থেকে ৬ কোটি টাকা লেনদেন হলেও এই সময়ে ১০ থেকে ১২ কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে গত বৃহস্পতিবার ও রোববার।’

বানেশ্বর বাজারের মোবাইল ব্যাংকিং দোকানের সত্বাধিকারী অজয় দাস বলেন, ‘আমের মৌসুমের আগে দিনে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা লেনদেন হতো। এখন সেই লেনদেন প্রতিদিন দুই লাখ ছাড়িয়ে যাচ্ছে। শুক্রবার ও শনিবার ব্যাংক বন্ধের কারণে ৫ লাখ টাকাও ছাড়িয়ে গেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে টাকা পাঠানো হচ্ছে। আমি বাদে অন্য ব্যবসায়ীদেও একই অবস্থা। আমাদের এখান থেকে উত্তোলন করা হচ্ছে।’

বানেশ্বর বাজারের ইজারদার ওসমান আলী বলেন, ‘বানেশ্বর আমের মোকাম মধ্যে সর্ববৃহৎ। এখানে আম কিনতে আসছেন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা। আমরা, বাজার কমিটি ও উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের সাথে বৈঠক করেছিলাম। এই বাজারে ব্যবসায়ীসহ ক্রেতা-বিক্রেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে।’
বানেশ্বর বাজার বণিক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জুবায়ের আহমেদ বলেন, ‘আমের জন্য বানেশ্বর বাজার বেশ জমজমাট। বর্তমানে এই বাজারে প্রতিদিন গড়ে প্রায় সাড়ে চার থেকে ৫ কোটি টাকার আম কেনা বেচা হয়। সেই সঙ্গে বাজারের আশপাশের ছোট দোকান ও আড়ৎগুলোতে আরও প্রায় অর্ধকোটি টাকার কেনা বেচা হচ্ছে।’

রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহীর ৯ উপজেলা ও মহানগরে এবার ১৮ হাজার ৫১৫ হেক্টর জমিতে আমবাগান আছে। হেক্টরপ্রতি গড় ফলন ধরা হয়েছে ১১ দশমিক ৫৯ মেট্রিক টন। আমের মোট উৎপাদন হতে পারে ২ লাখ ১৪ হাজার ৬৭৬ মেট্রিক টন। এর মধ্যে অনেক আম বাজারে চলে এসেছে। ১৫ জুন থেকে আম্রপালি ও ফজলি; ১০ জুলাই থেকে আশ্বিনা ও বারী-৪, ১৫ জুলাই থেকে গৌড়মতি এবং ২০ আগস্ট থেকে ইলামতি আম নামবে। আম দিয়ে রাজশাহীর অর্থনীতিতে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা যোগ হবে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোজদার হোসেন বলেন, ‘এবার এখন পর্যন্ত ঝড়, শিলাবৃষ্টি কিংবা অন্য কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়নি। বাকি সময়টা দুর্যোগ না এলে যে আম আছে তা দিয়েই চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে। কেননা, গাছে আম কম বলে সেগুলো বেশি বড় হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘এবার গাছে আম কম, তাই দাম বেশি। এতে চাষিরা উপকৃত হচ্ছেন। গত দুই বছর করোনা ও লকডাউনের কারণে আমের ব্যবসা হয়নি। তাই এবার দাম বেশি নেয়া হচ্ছে।’

SHARE