কাটাখালি মেয়রের বিতর্কিত অডিও , পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ কর্মসূচি

31

স্টাফ রির্পোটার : জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুর‌্যাল নিয়ে নৌকা প্রতীকে দুইবারের পৌর মেয়র আব্বাস আলীর কটুক্তিমূলক বিতর্কিত অডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। আব্বাসের ফাঁস হওয়া অডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ভাইরাল হওয়ায় রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে ব্যাপক তোলপাড়। আব্বাসের এ ধরনের ধৃষ্টতাপূর্ণ বক্তব্যের প্রতিবাদে এরইমধ্যে মুক্তিযোদ্ধাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক এবং সামাজিক সংগঠন তার পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে।

রাজশাহী-ঢাকা মহাসড়কের কাটাখালি পৌরসভার অংশের উন্নয়নকাজ নিয়ে কথা বলার সময় বঙ্গবন্ধুর মুর‌্যাল নিয়ে কটূক্তি করেন মেয়র আব্বাস। ১ মিনিট ৫১ সেকেন্ডের ওই অডিও ক্লিপটিতে মেয়র আব্বাস বলেন, ওই গেটটি দ্রুত নির্মাণ হবে। তবে আমরা যে ফার্মকে কাজটি দিয়েছি, তারা গেটের ওপরে বঙ্গববন্ধুর যে ম্যুরাল বসানোর ডিজাইন দিয়েছে, সেটি ইসলামের দৃষ্টিতে সঠিক না। তাই আমি সেটিকে বাদ দিতে বলেছি।

যেভাবে বুঝেছে তাতে আমার মুনে (মনে) হইছে (হয়েছে) যে, ম্যুরালটা হইলে (নির্মাণ হলে) আমার ভুল হইয়্যা (হয়ে) যাবে। এ জন্য চেঞ্জ করছি। এই খবরটাও যদি আবার যায় তো আবার রাজনীতি শুরু হয়ে যাবে। ওই বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল দিতে চাইয়্যা (চেয়ে) দিচ্ছে না! বঙ্গবন্ধুক খুশি করতে যাইয়া (গিয়ে) আল্লাহকে নারাজ করব নাকি? এইডা লিয়েও (এটা নিয়েও) রাজনীতি করবে কিন্তু আমি সিওর। তবে করলে কিছু করার নাই। মানুষকে সন্তুষ্ট করতে যাইয়া (গিয়ে) আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করা যাবে না তো।

ভাইরাল হওয়া ওই অডিওতে শুধু মেয়রের বক্তব্য শোনা যায়। তিনি কে বা কাদের সঙ্গে কথা বলছিলেন সেটি জানা যায়নি। অডিওতে এক পর্যায়ে একজনকে হাসতেও শোনা যায়। এছাড়া কিছু অংশে অন্য একজনকে কথা বলতে শোনা গেলেও তা অস্পষ্ট। এটি কে বা কারা কবে ধারণ করেছে সেটি জানা যায়নি। কে বা কারা এটি ফেসবুকে আপলোড করেছে সেটিও জানা যায় নি।

অডিওতে মেয়রকে বলতে শোনা যাচ্ছে, ‘সিটি গেট আমার অংশে। যে ফার্মকে দিয়েছি তারা বিদেশি স্টাইলে সাজিয়ে দেবে। ফুটপাত, সাইকেল লেন- টোটাল আমার অংশটা। কিন্তু একটু থেমে গেছি গেটটা নিয়ে। একটু চেঞ্জ করতে হচ্ছে। যে মুর‌্যালটা দিয়েছে বঙ্গবন্ধুর সেটা ইসলামী শরিয়ত মতে সঠিক নয়। এজন্য আমি ওটা রাখবো না।’

তবে অডিওটি তার বক্তব্য নয় বলে দাবি করেছেন মেয়র আব্বাস আলী। তিনি বলেন, ‘মুর‌্যাল করা যাবে না। মুর‌্যাল করলে পাপ হবে। এ ধরনের কথা আমার সঙ্গে করাও হয়নি। কেউ ভুল তথ্য ছড়াচ্ছে।’

দলীয় সূত্র মতে, আব্বাস আলী কাটাখালী পৌর আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক। ২০১৫ সালে তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে প্রথমবার মেয়র নির্বাচিত হন। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনেও তিনি নৌকা প্রতীক নিয়ে মেয়র নির্বাচিত হন।
এদিকে মেয়র আব্বাসের এমন মন্তব্যে রাজশাহীর আওয়ামী লীগ ও বিভিন্ন অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীদের মাঝে ব্যাপক ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। ফেসবুকেও মেয়র আব্বাসের বিরুদ্ধে দলীয় ব্যবস্থাসহ আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ারও দাবিও করছেন।

রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, মেয়র আব্বাস যদি এই ধরনের কথা বলেন তবে তিনি দলে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন। আওয়ামী লীগের রাজনীতি করবে আর বঙ্গবন্ধুর মুর‌্যাল নিয়ে কটূক্তি করবে এটা মেনে নেওয়া যাবে না।

রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অনিল কুমার সরকার বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে কটূক্তি করলে তার আওয়ামী লীগ করার অধিকার থাকে না। কাটাখালির মেয়র বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যদি কোনো কটূক্তি করে থাকেন তার বিরুদ্ধে দলীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে, নাম প্রকাশ না করার শর্তে কাটাখালি পৌরসভা আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা জানান, মেয়র আব্বাস এক সময় জাতীয়তাবাদী তরুণ দলের জেলা পর্যায়ের নেতা ছিলেন। পরে তিনি আওয়ামী লীগে আসেন। তার আরও চার ভাই সন্ত্রাসী প্রকৃতির। আব্বাস নিজেও কাটাখালির শাহাপুরের বাক্কার হত্যা মামলার আসামি। আরেক ভাই জাতীয় পার্টি নেতা আসের আলী ও একই মামলার আসামি। আব্বাস ও আসের এ মামলায় সাত থেকে আট বছর জেল খেটেছেন। আব্বাসের আরেক ভাই রাজশাহী জেলা যুবদলের সাবেক যুগ্ম আহবায়ক আরিফুল ইসলাম ওরফে মানিক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক লালনভক্ত ড. একেএম শফিউল ইসলাম লিলন হত্যা মামলার মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামি। মানিক বর্তমানে রাজশাহী কারাগারে শাস্তিভোগ করছেন। মেয়র আব্বাস নিজেও পৌরসভায় ভূমিদস্যু হিসেবেও পরিচিত।

অপরদিকে মেয়র আব্বাসের অডিওটি ফাঁস হবার পর আওয়ামী লীগ এবং অঙ্গ সংগঠনের নেতা কর্মীদের মধ্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা কর্মীরা আব্বাসকে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কারের দাবি জানাচ্ছেন।
ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা বর্তমানে রাজশাহী মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের দফতর সম্পাদক অরবিন্দ দত্ত তার ফেসবুক আইডিতে লেখেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবমাননার জন্য কুলাঙ্গার বেঈমান জামায়াত-শিবিরের এজেন্ডা বাস্তবায়নকারী আব্বাস আলীর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার, মেয়র পদ থেকে দ্রুত অপসারণ এবং আইন অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে কটূক্তি এবং বঙ্গবন্ধুর মুর‌্যাল নির্মাণ প্রতিহতের ঘোষণা দেয়ার প্রতিবাদে রাজশাহীর কাটাখালী পৌরসভার মেয়র ও পৌর আওয়ামী লীগের আহবায়ক আব্বাস আলীর বিরুদ্ধে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে আওয়ামী লীগ। বুধবার (২৪ নভেম্বর) বেলা সাড়ে ১০ টায় কাটাখালি বাজারে এ বিক্ষোভের কর্মসূচি ঘোষণা করেন পৌরসভা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহবায়ক জহুরুল আলম রিপন।

মঙ্গলবার দুপুরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আওয়ামী লীগ এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের পক্ষ থেকে এই বিক্ষোভের কর্মসূচি দেয়া হয়েছে। আমাদের দাবি, দ্রুত মেয়র আব্বাস আলীকে আওয়ামী লীগ থেকে স্থায়ীভাবে বহিস্কার করতে হবে। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে মেয়র পদ থেকেও তাকে অপসারণ করার দাবি জানানো হবে এই বিক্ষোভ কর্মসূচিতে। এছাড়া একই দাবিতে রাজশাহী মহানগরীর জিরোপয়েন্ট এলাকায় একই সময়ে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছেন রাজশাহীর বীর মুক্তিযোদ্ধারা।

SHARE