ফরিদপুরে ছয়’শ বছরের পুরনো হুসেনশাহী আমলের আউলিয়া মসজিদ

28

সোহাগ মাতুব্বর ,ভাঙ্গা : ফরিদপুরের ভাঙ্গার পাতরাইল মসজিদ যা স্থানীয়ভাবে পাতরাইল দিঘীড়পার আউলিয়া মসজিদ নামে বেশ পরিচিত। উপজেলার আজিমনগর ইউনিয়নের পাতরাইল গ্রামে এই প্রাচীন মসজিদটির অবস্থিত। তবে এর নির্মাণ সাল সুনির্দিষ্টভাবে কেউ বলতে পারেন না। তবে কেউ বলেন ৭ শত বছর আবার কেউ বলেন ৮ শত বছরের পুরনো ঐতিহাসিক এ মসজিদ।

মসজিদটি বর্তমানে প্রত্মতত্ত্ব বিভাগের নিয়ন্ত্রনাধীন। সে অনুযায়ী ২০১৯ সালে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ মসজিদটির মেরামত ও সংস্কার কাজ করেন।

এলাকার একাধিক প্রবীণ ব্যাক্তিদের তথ্য মতে- পাতরাইল মসজিদের দক্ষিণ পাশ্বেই চির নিন্দ্রায় শাহিত আছেন মহান আউলিয়া মজলিস আউলিয়া খান। মজলিস আউলিয়া নামক একজন ধর্মপ্রাণ সাধকের নামানুসারে মসজিদটির নামকরণ করা হয়েছে। তবে পাতরাইল মসজিদ নামে বেশিরভাগ মানুষের কাছে পরিচিত হলেও এই মসজিদটির অন্য আরও দুটি নাম আছে। দীঘিরপাড় মসজিদ এবং মজলিশ আউলিয়া মসজিদ। অনেকের ধারনা করেন, ঐতিহ্যবাহী এই প্রাচীন মসজিদটি গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ ১৩৯৩ খ্রিস্টাব্দ হতে ১৪১০ খ্রিষ্টাব্দ এর মধ্যে নির্মাণ করেছিলেন।

খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, শাহ ইসমাইল এবং শাহ ইউসুফ নামক দুই ব্যক্তির আহ্বানে এক সাধক দরবেশ সুদূর বাগদাদ থেকে এসে এখানে বসবাস করতেন এবং তিনিই এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। গবেষকগণ মনে করেন,
মসজিদটি আয়তাকার বহু-গম্বুজ বিশিষ্ট। এর নকশা এবং স্থাপত্য শৈলী রাজশাহীর বাঘা মসজিদ এর মত। পঞ্চভূজ খিলান বিশিষ্ট মূল প্রবেশদ্বারটি পূর্বদিকে।

ঐতিহাসিক মসজিদটির আঙ্গিনায় রয়েছে দরবেশ নাজিমদ্দিন দেওয়ানের মাজার। আউলিয়া খানের মাজারের দক্ষিণ পাশে রয়েছে ফকির ছলিমদ্দিন দেওয়ানের মাজার। জনশ্রুতি আছে যে, তৎকালীন অত্র অঞ্চলের প্রজাদের পানীয় জলের সমস্যা নিরসনকল্পে, ওজু ও ইবাদতের জন্য মসজিদের পার্শ্বেই ৩২.১৫ একর জমির উপর একটি বিশাল দীঘি খনন করা হয়।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পাতরাইল ঐতিহাসিক এ মসজিদটি ১০ গম্বুজ বিশিষ্ট। মসজিদটির দৈর্ঘ্য ৮৪ ফুট, প্রস্থ ৪২ ফুট। মসজিদের চার কোণে রয়েছে ৪ টি মিনার। মসজিদের দেয়াল ৭ ফুট প্রশস্ত। মসজিদের ভিতরে ৪ টি স্তম্ভ বা থাম আছে। পূর্ব দিকে ৫ টি এবং উত্তর ও দক্ষিণ দিকে ২ টি করে মোট ৯ টি দরজা আছে। এ ছাড়াও কিবলা প্রাচীরের পাঁচটি অবতলাকৃতি মিহরাব রয়েছে যা পূর্ব দিকের খিলান পথ বরাবর। মিররাবগুলো কুইঞ্চের সাহায্যে নির্মিত। উত্তর ও দক্ষিণ দিকে কৌনিক খিলানপথ রয়েছে। ছাদে সর্ব মোট দশটি গম্বুজ থাকায় ধারণা করা হয় এটি সুলতানী আমলের আয়তাকার দশগম্বুজ টাইপের অন্তর্গত একটি মসজিদ। এর প্রধান ফটকের উপরে দুটি পাথরের শিলালিপি এবং ভিতরে একই রকম আরও দুটি শিলালিপি দেখতে পাওয়া যায়। যদিও সেগুলো অস্পষ্ট।

মসজিদটি ষােড়শ শতাব্দীর সুলতানি আমলের মসজিদ বলেও অনেকে মত দিয়েছেন। কেউ কেউ আবার এর নির্মাণ শৈলীর গঠন অনুযায়ী মসজিদটি হুসেন শাহী আমলের বলে ধারণা করেন। ঐতিহাসিক এ মসজিদটিতে হাফেজ আবুল বাশার(৪৬),সিব্বির আহমেদ (৪৫) নামে দুই জন ইমাম, মোঃ ওমর আলী সিকদার (৫৬) নামে একজন মুয়াজ্জিন ও মোঃ হাসান (২১) নামে একজন ঝাড়ুদার নিয়োজিত রয়েছেন।

এলাকাবাসীর দাবী, মসজিদটি ঢাকা হতে দক্ষিণ বঙ্গের হাইওয়ের রাস্তা সংলগ্ন, সেহেতু মসজিদটিসহ উক্ত দীঘিটিকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করে উন্নয়ন করলে সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাওয়ার যথেষ্ট সম্ভবনা আছে। পাতরাইল মসজিদে যেতে ফরিদপুর থেকে ফরিদপুর-বরিশাল মহাসড়কে ভাঙ্গা গেলচত্ত্বরে নেমে ভাঙ্গা-মাওয়া বিশ্বরোডে ৮ কিঃ মিঃ পূর্বদিকে পুলিয়া নামক স্থান থেকে মাত্র ৪ কিলোমিটার দক্ষিণে পাতরাইল মসজিদের অবস্থান।

এই বিষয়ে স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব সোহাগ মাতুব্বর বলেন, পাতরাইল মসজিদ বা ঐতিহাসিক মজলিস আউলিয়া মসজিদটি ও দীঘির রক্ষার্থে সরকারের আরো সুনজর দিতে হবে। এছাড়া মসজিদে যাওয়ার সংযোগ সড়ক ও একটি ছোট ব্রিজ রয়েছে, যা খুবই সরু। সড়ক ও রাস্তার সংস্কার করা দরকার। এ ছাড়াও দিঘি ঘিরে কিছু সংস্কার করা হলে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন পর্যটকদের আকর্ষণ করা সম্ভব।

ঐতিহ্যবাহী মসজিদটিতে দ্বায়িত্বরত ইমাম হাফেজ আবুল বাশার(৪৬) বলেন, তিনি এ মসজিদে ১৯৯০ সাল থেকে ইমামতি করছেন। মসজিদটির বয়স কত বছর তা জানা নেই। তিনিও এলাকার প্রবীণ ব্যক্তিদের মুখে শুনা মতে, মসজিদটির বয়স সাতশত থেকে আটশত বছর হবে।

বিশ বছর আগে যোগাযোগ ব্যবস্থা খুব খারাপ ছিল। তখন প্রতিদিন গড়ে দুই থেকে তিন শত লোক নামাজ আদায় করতেন। আর এখন প্রতিদিন গড়ে এক থেকে দেড় হাজার মানুষ এ মসজিদে নামাজ পড়েন। প্রতি শুক্রবারে স্থানীয় ও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আগত গড়ে প্রায় তিন হাজার ধর্মপ্রাণ মানুষ জুম্মার নামাজ পড়েন।

তিনি আরও বলেন, মসজিদটি চুন-সুরকি দিয়ে তৈরি। বড় বৃষ্টির সময় মসজিদে পানি পড়ে। বর্তমানে কোন কেয়ার টেকার নেই। তাই পরিস্কার পরিচ্ছন্নতায় বেশ সমস্যা চলছে। এর আগে বীরমুক্তিযোদ্ধা গিয়াসউদ্দিন মাতুব্বর নামে একজন কেয়ারটেকার ছিলেন। তিনি অবসরে যাওয়ার পর দীর্ঘদিন পদটি শূন্য রয়েছে। এছাড়া মসজিদের দিঘিটি মাছ চাষের জন্য লিজ দেওয়া। যার কারনে দিঘির পানি ব্যবহার করা অনুপযোগী। গোসল করা থেকে শুরু করে ওজু করতে সমস্যা হয়। দূর-দূরান্ত থেকে আগত দর্শনার্থীরা গোসল কিংবা ওজু করতে সমস্যার সম্মুখীন হন।

মসজিদ কমিটির সভাপতির বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সামাদ মিয়া বলেন, মহিলাদের জন্য গোসল-ওজুর ব্যবস্থা নেই। মসজিদে গণ শৌচাগার সংকট রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে তিনি সরকারের কাছে আবেদন জানান।

এই বিষয়ে ভাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ আজিম উদ্দিন বলেন, আমি ইতিপূর্বে পাতরাইল মসজিদ সরেজমিনে পরিদর্শন করেছি। মসজিদটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অর্ন্তভুক্ত। যার কারনে ইচ্ছা হলেও কোন কিছু পরিবর্তন বা সংস্কার করা সম্ভব নয়। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নির্দেশনা দেওয়া আছে। সে অনুযায়ী অনুমতি নিয়ে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, পরিদর্শনের সময় আমার কাছে মনে হয়েছে সন্ধ্যার পর আলোর স্বল্পতা রয়েছে। সোলার সিস্টেম বসিয়ে খুব দ্রুত আলোর ব্যবস্থা করা হবে।

তিনি আরো বলেন, ইতিপূর্বে পাতরাইল মসজিদ কে গিরে উপজেলা প্রশাসনের কিছু চিঠি চালাচালি হয়েছ। আমি উর্ধতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছি তাদের কে চিঠি লিখেছি এই দীঘিকে ঘিরে যেন একটি পর্যটন কেন্দ্র তৈরি করা হয়। পর্যটন কেন্দ্র তৈরি করতে পারলে অনেক বেশী দর্শনার্থী ও পর্যটকদের আকৃষ্ট করা সম্ভব হবে।

SHARE