চাঁপাইনবাবগঞ্জ ভাঙারি ব্যবসার আড়ালে গড়ে উঠেছে অপরাধ চক্র

41

ফয়সাল আজম অপু, চাঁপাইনবাবগঞ্জ : চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার ছত্রাজিতপুরসহ বিভিন্ন স্থানে ভাঙারি ব্যবসার আড়ালে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী বিভিন্ন অপরাধী সিন্ডিকেট। এ সকল সিন্ডিকেটের সদস্যরা এলাকায় চুরি, ছিনতাই, মাদক, জুয়াসহ বিভিন্ন অপরাধের সাথে সক্রিয় রয়েছে বলে জানা যায়।

স্থানীয় প্রশাসনের নাকের ডগায় ওইসব চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন অপকর্ম প্রকাশ্যে চালিয়ে গেলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের রহস্যজনক নীরবতা এলাকার জনমনে নানা প্রশ্ন দানা বেঁধে উঠেছে।

জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার ছত্রাজিতপু বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠা ভাঙারি ব্যবসাকে কেন্দ্র করে ওইসব দোকানি ও সিন্ডিকেট সদস্যরা স্বল্প বেতন কিংবা কমিশনে স্থানীয় মাদকসেবী, বখাটে যুবক ও ছিচকে চোরদের কাজে লাগিয়ে এবং তাদের ব্যবহার করে বিভিন্ন বাসা বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, দোকান-পাট, সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে বিভিন্ন প্রকার লোহার মালামাল, টিন, স্টিল, তামা, পেপার, বই, এল্যুমিনিয়াম, প্লাস্টিক ও টায়ার, নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য চুরি করিয়ে তা কম দামে ক্রয় করে বিশাল মজুদ গড়ে তুলে দেশের বিভিন্ন মিল-কারখানায় বিক্রি করে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা।
এ পেশায় এলাকার প্রায় শতাধিক ভাঙারি দোকানের সাথে প্রায় দুই সহস্রাধিক শিশু-কিশোর এবং নারী জড়িত। এদের মূলত সংশ্লিষ্ট বিভাগের কোন বৈধ কাগজপত্র নেই।

জানা যায়, ভাঙারি ব্যবসায়ীরা তাদের নিযুক্ত ফড়িয়া-হকার কিংবা খুচরা ক্রেতাদের মাধ্যমে বিভিন্ন স্থান থেকে বিভিন্ন সিন্ডিকেট সদস্যরা রাতের অন্ধকারে টিউবওয়েলের মাথা, লোহার পাইপ, গাড়ির যন্ত্রাংশ, প্লাস্টিক সামগ্রী, নতুন-পুরাতন রড, সরকারি-বেসরকারি দপ্তর কিংবা আবাসিক এলাকায় পরিত্যাক্ত পড়ে থাকা বিভিন্ন মালামাল নিয়ে এসে ভাঙারি দোকানে বিক্রি করে দিচ্ছে।
এমন কি এসব চোরের দল সুযোগ বুঝে বাসা বাড়ি কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে নগদ অর্থ, স্বর্নালংকারসহ মূল্যবান সামগ্রী চুরি করে।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ ও স্থানীয় বিভিন্ন ক্যাডারদের ব্যবহার করে এ ভাঙারি ব্যবসাটি খুবই লাভজনক বিধায় শিবগঞ্জ উপজেলার ছত্রাজিতপু আনাচে-কানাচে, অলি-গলিতে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ভাঙারি দোকান।

ভাঙারি দোকানগুলোতে শ্যালু যন্ত্রাংশ, ইলেকট্রনিক্স মোটর, রেলের সিøপার-পাতসহ অন্যান্য মূল্যবান যন্ত্রাংশ, ফ্যান, দরজা-জানালার গ্রিল, টিউবওয়েল, যানবাহনের যন্ত্রাংশ, সাইকেল-রিকশাসহ বিভিন্ন পরিবহনের চাকা, বিদ্যুত সরঞ্জাম, যন্ত্রপাতি, এল্যুমিনিয়াম ও তামার দ্রব্য, লোহারপাত ও পাইপ এবং রডসহ বিভিন্ন লৌহজাত দ্রব্য প্রকাশ্যে বেচাকেনা হচ্ছে এবং প্রতিনিয়ত দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার হচ্ছে।

এসবের পেছনে স্থানীয় মাদকাসক্ত ছিচকে চোর, বখাটে মাদকাসক্ত যুবক, মাদকাসক্ত মহিলা ও শিশু-কিশোর-কিশোরীদের বিভিন্ন অপরাধী সিন্ডিকেট সহযোগিতা দিয়ে আসছে।

তবে এনিয়ে প্রশাসনের মাথা-ব্যাথা না থাকায় ভাঙাড়ি ব্যবসার আড়ালে অপরাধীচক্র গড়ে তোলার কাজটি এখন ওপেন সিক্রেট। বিনিময়ে পানির দরে চোরাইপণ্য কিনে ভাঙাড়ি ব্যবসায়ীরা আঙুল ফুলে কলা গাছ- রাতারাতি কোটিপতি বনে যাচ্ছে।
নির্ভরযোগ্যে বিভিন্ন সূত্রের তথ্যমতে, শিবগঞ্জ গোটা উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী ঘরভাড়া করে অথবা খুপড়ি ঘর বানিয়ে লাইন্সেস বিহীন ভাঙাড়ি ব্যবসা করে আসছে। টিন, প্লাষ্টিক, তার, পিতল, কাঁসাসহ বিভিন্ন পরিত্যক্ত জিনিস ক্রয়-বিক্রয়ের আড়ালে তারা চোর সিন্ডিকেট তৈরি করে চোরাই ব্যবসা শুরু করেছে।

শিবগঞ্জ উপজেলার ছত্রাজিতপুর ছাড়াও সদর উপজেলার পিটিআই, আরামবাগ, মহারাজপুর মেলার মোড়, আমনুরা-ধীনগর মোড় সহ গুরুত্বপূর্ণ হাট-বাজারে বেশকিছূ ভাঙাড়ির দোকান রয়েছে। নাচোল উপজেলার কালহর বাজার, গোমস্তাপুর উপজেলার রহনপুর হুজরাপুর ও কলেজ মোড়ের পাশে কয়েকটি ভাঙারি দোকান আছে। বিশেষ করে শিবগঞ্জ উপজেলার ছত্রাজিতপুর বাজারেই ছোট-বড় প্রায় শতাধিক ভাঙাড়ি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তারা মূলত, চোর সিন্ডিকেটের কাছে আগাম টাকা দিয়ে চুরি ডাকাতি ও ছিনতাইসহ অপরাধীদের উৎসাহিত করছে। ওই চক্রটি গভীর নলকুপ, গাছে কীটনাশক দেয়া স্প্রে মেশিন, লোহার রড, টিন, ট্রান্সফরমার ও মোবাইল টাওয়ারের যন্ত্রাংশ, ব্যাটারী, সেচ মেশিন, মটর পাম্প, ব্রিজের রেলিংপাতিসহ মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি করে, দাদন নেওয়া ভাঙাড়ি ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে। সূত্রমতে একজন ভাঙাড়ি ব্যবসায়ী কমপক্ষে সিন্ডিকেটের ১০ থেকে ৫০ জনকে আগাম টাকা দিয়ে থাকে। তাদের মধ্যে অধিকাংশ ব্যক্তি চুরির সাথে জড়িত।

ভাঙাড়ি ব্যবসায়ীরা অগ্রিম টাকা দিয়ে সাধারন ব্যবসায়ীদের চুরির কাজে সহায়তা করে। এতে করে সাধারণ মানুষকে চোর আতঙ্কে ফেলেছে। শিবগঞ্জ উপজেলার ছত্রাজিতপুরের একাধিক ব্যবসায়ী এ চক্রকে কাজে লাগিয়ে রাতারাতি মোটা অংকের টাকার মালিক বনে যাচ্ছে। ওই চক্র গভীর রাতে নৌকা, ভ্যান ও পিকাপে প্লাষ্টিকের ড্রামের মধ্যে লুকিয়ে ট্রান্সফরমার ও মোবাইল টাওয়ারের যন্ত্রাংশ, ব্যাটারী, সেচ মেশিন, এনে ভাঙাড়ি দোকানে পৌছে দেয়। ভাঙাড়ি ব্যবসায়ীরা রাতারাতি এসব চোরাই মালপত্র গোডাউনে সরিয়ে ফেলে। পরে সুযোগ মতো ঢাকা ও চট্টগ্রামে পাচার করে দেয়।

ছত্রাজিতপুর বাজার-মিয়াপাড়া এলাকার মেসার্স দ্বীপ মেশিনারীজ এর মালিক ভাঙাড়ি ব্যবসায়ী বিপলব মিয়া বলেন, আমার দোকানের ট্রেড লাইন্সেস ছাড়া আর কিছু নাই। তবে ট্রেড লাইসেন্স দেখতে চাইলে সেটাও দেখাতে ব্যর্থ হন তিনি। তিনি আরও বলেন, আমার আন্ডারে ২০ থেকে ২৫ জন ব্যবসায়ীকে দাদন দেয়া আছে। আমি তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন মালপত্র ক্রয় করি। সম্প্রতি তিনি শিবগঞ্জ ধাইনগর ইউনিয়নের পোলাডাঙ্গা এলাকার টুুটুলের নিকট একটি গাছে দেয়া চোরাই স্প্রে মেসিন, অটো চার্জার ভ্যান ও একটি চোরাই অটো রিক্সা ক্রয়ের পর বিষয়টি জানাজানি হলে তড়িঘড়ি করে তিনি স্প্রে মেশিন ও অটোভ্যান বিক্রি করে দেয়। তবে অটোরিকশা সরজমিনে শনিবার (২৮ আগষ্ট) গিয়ে ভাংগা অবস্থায় তার গোডাউনে হাতেনাতে পাওয়া যায়। চোরাই স্প্রে মেসিন চার্জার ভ্যান ও অটো রিক্সা কেনার বিষয়ে তিনি বলেন আমার কাছে টুটুল নামে একজন তার নিজের পরিচয় দিয়ে বিক্রি করেছে। তিনি জানান গত কয়েকদিন আগে ব্যাটারি চালিত রিক্সার মূল্য ৩০ হাজার টাকা হলেও মাত্র ৪ হাজার টাকা ও ভ্যান সহ স্প্রে মেশিনের মূল্য ৫০ হাজার টাকা হলেও মাত্র ১৫ হাজার টাকায় কিনে নিয়েছে মালিক বিপলব মিয়া।
বিপলব মিয়ার কাছে এবিষয়ে জানতে চাইলে তিনি, স্প্রে মেশিন, চার্জার ভ্যান ও অটো রিক্সা কিনে নেয়ার কথা অকপটে স্বীকার করে বলেন, আমি স্বস্তায় পেয়ে কিনে নিয়েছি। অবস্য অটো রিক্সা তিনি ফেরত দেন। এবং স্প্রে মেশিন বিক্রি হয়ে যাওয়ায় শর্ত সাপেক্ষে মুল্যে ফেরত দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি জানান কেজি প্রতি শ্রেণি সাপেক্ষে ২৭ টাকা থেকে ৪৫ টাকা দামে কিনে নিই বলে দায়সারা কথা বলেন। ওইসব অবৈধ ভাঙাড়ি ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেয়ায় এলাকায় চোরসিন্ডিকেটের তৎপরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
চোরাইকৃত স্প্রে মেশিন ও চার্জার ভ্যান ছাড়াও মাদকাশক্ত যুবকরা বিভিন্ন মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি করে এনে ভাঙাড়ির দোকানে বিক্রি করছে। এর ফলে সহজে মাদক সেবনে ঝুঁকে পড়ছে এলাকার যুব সমাজ।

এতে মাদক সেবনের সংখ্যাও দিন দিন বেড়ে চলছে বলে সচেতন জেলাবাসির অভিযোগ। অভিযোগ রয়েছে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক শ্রেণীর অসাধু সদস্যদের সঙ্গে তাদের উৎকোচের চুক্তি থাকায় চক্রটি নিরাপদে এই অবৈধ কারবার চালিয়ে যাচ্ছে।

পিটিআই এলাকার নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন পুরাতন ভাঙারি ব্যবসায়ী বলেন আমি বাপ-দাদার আমল থেকে সততার সহিত এই ব্যবসা করে আসছি। আমি কখনো চোরাই পণ্যে কিনিনা, তিনি ছত্রাজিতপুরের ভাঙারি ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন ওদের চোরাই পণ্যে কেনার জন্য আমাদের বদনাম হচ্ছে এবং ব্যবসাটা ধংসের দিকে যাচ্ছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোজাফফর হোসেন বলেন, আমি বিষয়টি শুনেছি এবং অভিযানও শুরু করেছি। গত ১২ আগষ্ট ২০২১ তারিখ ঝিলিম ইউনিয়নের ধীনগর এলাকায় রাইহান নামের একজন কৃষকের গভীর নলকুপ থেকে মর্টারের ও মিটারের তার রাতের আঁধারে চুরি হয়ে যায়। পরেরদিন গোপন সুত্রে কৃষক রাইহান অনেক খোঁজাখুঁজি করে ১৩ আগষ্ট একই এলাকায়
ধীনগর মোড়ের ভাঙারী ব্যবসায়ী তাজরুলের গোডাউন থেকে পুলিশের সহযোগিতায় চোরাইকৃত তার সহ তাজরুলকে আটক করে। চোরাইকৃত তার কোথায় পেয়েছে জানতে চাইলে তাজরুল বলেন, ধীনগর গ্রামের কালো খোকার ছেলে আলম আমার কাছে বিক্রি করেছে।
চোর আলম ও একই এলাকার ভাঙারি ব্যবসায়ী তাজরুলের এসকল চুরির যোগসাজশ রয়েছে। চুরির মামলা হয়েছে। মামলা নং (৩৬১৮(৩)/১,১৫-৮-২০২১) অবশ্য মূল আসামি আলম পলাতক রয়েছে, তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। গ্রেপ্তার হলে তার কাছ থেকে আরও তথ্য পাওয়া যাবে। এই অভিযান চলমান থাকবে বলেও জানান ওসি মোজাফফর।

অপরদিকে, এবিষয়ে শিবগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফরিদ হোসেন মুঠোফোনে এ প্রতিবেদকে জানান, এবিষয়ে আমি অবগত নয়। কেউ অভোযোগও করেননি। তবে কোন ভাঙাড়ি ব্যবসায়ী চোরাই মাল কিনেছে এমন প্রমাণ পাওয়া গেলে তার ছাড় নেই আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

SHARE