সফলতার এক বছর আরএমপি সাইবার ক্রাইম ইউনিট

52
২০২০ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর পুলিশ কমিশনার মোঃ আবু কালাম সিদ্দিক সাইবার ক্রাইম ইউনিটের উদ্বোধন করেন।

স্টাফ রির্পোটার :  রাজশাহী মেট্রোপলিটান পুলিশ (আরএমপি) এর সাইবার ক্রাইম ইউনিটের সফলতার এক বছর অতিবাহিত হল। ২০২০ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর একজন সহকারী পুলিশ কমিশনারের নেতৃত্বে সাইবার ক্রাইম ইউনিটের যাত্র শুরু। তাঁর সাথে ছিলেন, একজন এসআই, একজন এএসআই এবং তিনজন কনস্টেবল- অর্থাৎ মোট ৬ জন দক্ষ ও প্রশিক্ষিত সদস্য নিয়ে আরএমপিতে একটি সম্পূর্ণ পৃথক সাইবার ক্রাইম ইউনিট গঠন করা হয়। পরবর্তীতে আরও কিছু প্রশিক্ষিত সদস্য যুক্ত হয়ে বর্তমানে ১৩ সদস্য বিশিষ্ট একটি দক্ষ, প্রশিক্ষিত ও চৌকস টিম এই ইউনিটে কাজ করছেন।

 

পুলিশ কমিশনার মোঃ আবু কালাম সিদ্দিক

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানাচ্ছে, সরাসরি অপারেশনাল টিম হিসেবে ফিল্ডে কাজ না করার কারণে অনেকেই এই ইউনিটের কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত নন। মূলত এই ইউনিট রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের সকল কার্যক্রমে বিশেষ করে সাইবার অপরাধ ও অপরাধী শনাক্তকরণসহ গ্রেফতারে সহায়তা প্রদানের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। মেট্রোপলিটন এলাকার সকল ক্লু-বিহীন ঘটনা উদঘাটন, অপরাধী শনাক্তকরণ ও গ্রেফতারে সহায়তার কাজ নিয়মিতভাবে করে যাচ্ছে।

সূত্রমতে, এক বছরে রাজশাহী মেট্রোপলিটনসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার মধ্যে প্রায় ৩৬০ টির মত ফেইসবুক সংক্রান্ত অপরাধের অভিযোগ এসেছে এই ইউনিটে। উল্লেখযোগ্য ফেইসবুক সংক্রান্ত অভিযোগের মধ্যে রয়েছে নারীদের বিভিন্ন স্পর্শকাতর ছবি/ভিডিও সোসাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে ব্লাকমেইল করা, ফেইসবুকে যে কারো ছবি দিয়ে ভুয়া একাউন্ট তৈরি করা, সোসাল মিডিয়ায় বিভিন্ন আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও ছেড়ে দিয়ে মানহানি করা, ফেইসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাকড করা, বিভিন্ন ভুয়া মেসেঞ্জারের মাধ্যমে পর্ন ছবি ও ভিডিও পাঠানোসহ ফেইসবুকের মাধ্যমে সংঘটিত সব অপরাধ। ফেইসবুক সংক্রান্ত প্রায় ৩৬০ টি অপরাধের মধ্যে ৩৪০ টির মত নিষ্পত্তি করেছে এই সাইবার ক্রাইম ইউনিট।

এরপর আছে বিকাশ, নগদ, রকেটসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিকস মানি ট্রান্সজেকশন/ ট্রান্সফার সিস্টেমের অপরাধ। বিভিন্ন ভুয়া অফারের মাধ্যমে পিনকোড নিয়ে বিকাশ অ্যাকাউন্ট হ্যাকড, ভুয়া রেজিস্ট্রেশন, সংঘবদ্ধ অপরাধীদের বিকাশ, নগদ ও রকেট চক্রের পরিকল্পনামাফিক ফাঁদসহ অন্যান্য অপরাধ। গত ১ বছরে এই সংক্রান্ত প্রায় ৫০ টি’র অভিযোগ এসেছে এবং সব ক’টির নিষ্পত্তি করেছে এই ইউনিট।

ইমো সংক্রান্ত ৩ টি অভিযোগ এসেছে এই ইউনিটে এবং সব ক’টিরই নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত অপরাধের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ইমো ব্যবহার করে সম্পর্ক স্থাপন ও আর্থিক প্রতারণা মত ঘটনা।

পর্নগ্রাফি সংক্রান্ত অপরাধের প্রায় ৫০ টির মত অভিযোগ এসেছে এই ইউনিটে। এই সংক্রান্ত অপরাধের সব ক’টির অপরাধী শনাক্ত ও গ্রেফতারে ভূমিকা রেখেছে এই ইউনিট। উল্লেখযোগ্য অপরাধ হলো পূর্বে প্রেমের সম্পর্ক ছিলো কিন্তু বর্তমানে নেই- তাই সাবেক প্রেমিক/প্রেমিকাকে হেনস্থা বা ব্লাকমেইল করার জন্য বিভিন্ন জনের কাছে বিভিন্ন ছবি/ ভিডিও প্রচার করা।

ই-মেইল সংক্রান্ত ৩ টি অভিযোগ এসেছে। এর মধ্যে ২ টি অভিযোগের নিষ্পত্তি হয়েছে এবং একটি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এ সংক্রান্ত উল্লেখযোগ্য অপরাধ হলো ই-মেইল হ্যাকড করে বিভিন্ন অপ্রীতিকর তথ্য পাঠানো ও ভুয়া বা বেনামে মেইল আইডি খুলে বিভিন্ন অপরাধ করা।
টিকটক/লাইকি সংক্রান্ত মোট ৫ টি অভিযোগ এসেছে এবং সবগুলোরই শনাক্ত পূর্বক নিষ্পত্তি করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য অপরাধ হলো বিভিন্ন উঠতি বয়সের ছেলে মেয়েদের বিভিন্ন প্রলোভন দিয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত করা।

প্রায় ৩০ টির মত অপহরণের অভিযোগ এসেছে এই ইউনিটে এবং প্রত্যেকটি ঘটনার ভিক্টিম উদ্ধারসহ আসামি শনাক্তকরণ ও গ্রেফতারে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেছে। উল্লেখযোগ্য অপরাধ হলো অপ্রাপ্ত/অল্প বয়সী মেয়ে/ছেলেদের সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলে বিভিন্ন প্রলোভন দিয়ে অপহরণ করা, বিভিন্ন আর্থিক বিষয়ে অপহরণ করা।

হারানো বা চুরি বা ছিনতাই হওয়া মোবাইল উদ্ধারের মত অনেক সফলতা রয়েছে এই ইউনিটের। এক বছরে প্রায় ৮২০ টির মত অভিযোগ/জিডি এসেছে এবং প্রায় ৭৫০ টি মোবাইল উদ্ধার করার তথ্য সরবরাহ করা হয়েছে।

লিখিত বিভিন্ন অপরাধ ছাড়াও মেট্রোপলিটন এলাকার অন্যান্য ক্লু-বিহীন ঘটনা ও সংঘবদ্ধ অপরাধ ও অপরাধী শনাক্ত পূর্বক গ্রেফতারে প্রতিনিয়ত নিরবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলছে এই ইউনিট। বিভিন্ন ধরনের অপরাধসহ সর্বমোট প্রায় ১৩২১ টির মত অভিযোগ এসেছে এবং ১২৩০ টির মত অপরাধ এর নিষ্পত্তি করেছে আরএমপি’র নবগঠিত সাইবার ক্রাইম ইউনিট যেখানে সফলতার হার প্রায় ৯৩ শতাংশেরও উপরে।
এছাড়াও সাইবার ক্রাইম ইউনিট বাংলাদেশের সকল ইউনিটের মধ্যে সর্বপ্রথম কিশোরদের ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি করেছে। যেখানে রাজশাহী মহানগর এলাকার প্রায় ৫শো কিশোরের তথ্য সংরক্ষিত রয়েছে। এছাড়া রাজশাহী মহানগর এলাকার প্রায় ৯ টির মত কিশোর গ্যাং এর বিস্তারিত তথ্য সংরক্ষণ করা হয়েছে। প্রতিদিন আরএমপির প্রত্যেকটি থানার মাধ্যমে ডাটাবেজ এ সংরক্ষিত কিশোরদের তদারকির ব্যবস্থা করা হয়েছে।
আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশিং সেবার অন্যতম বহুল তথ্য সংবলিত ‘হ্যালো আরএমপি’ অ্যাপস সাইবার ক্রাইম ইউনিট কর্তৃক পরিচালিত হয়। আপনার পরিচয় গোপন করে বিভিন্ন অভিযোগ ও তথ্য প্রদান করতে পারবেন। এছাড়াও এই অ্যাপস এর মাধ্যমে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের সকল তথ্য আপনি অতি সহজেই পাবেন। এখন পর্যন্ত প্রায় ২২৪ টির মত অভিযোগ এই অ্যাপস এর মাধ্যমে পাওয়া গিয়েছে এবং সবগুলো অভিযোগের নিষ্পত্তি করা হয়েছে।

রাজশাহী মহানগর এলাকার সার্বিক আইন শৃংখলা মনিটরিং, বিভিন্ন অপরাধ ও অপরাধী শনাক্তকণে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখা রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের অপারেশন কন্ট্রোল অ্যান্ড মনিটরিং সেন্টার (সেন্ট্রাল সিসি ক্যামেরা ইউনিট) ও পরিচালিত হয় আরএমপির সাইবার ক্রাইম ইউনিট মাধ্যমে। রাজশাহী মহানগরীর প্রায় ৫শো গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে সিসি ক্যামেরা স্থাপন পূর্বক পুরো মহানগরীকে নজরদারিতে নিয়ে আসার মত কঠিন কাজও করে যাছে এই ইউনিট। এখন পর্যন্ত প্রায় ২২৭ টির মত ঘটনার অপরাধ ও অপরাধী শনাক্তকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এই ইউনিট।
সর্বোপরি সাইবার ক্রাইম ইউনিট নিরবে রাজশাহী মেট্রোপলিটন এলাকার জঙ্গি ও রাষ্ট্র বিরোধীদের শনাক্তসহ অন্যান্য সকল অপরাধ ও অপরাধী শনাক্তকরণ ও গ্রেফতারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলছে।

পুলিশ কমিশনার মোঃ আবু কালাম সিদ্দিক

পুলিশি সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে আইজিপি নানাবিধ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ১০ সেপ্টেম্বর ২০২০ আরএমপি’র পুলিশ কমিশনার হিসেবে যোগদান করেন অনন্য ব্যক্তিত্ব, মানবিক, চৌকস এবং চিন্তা ও মননে আধুনিক পুলিশ কর্মকর্তা মোঃ আবু কালাম সিদ্দিক।

SHARE