রামেকের করোনা ইউনিটেও দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা

28
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে করোনা ইউনিটে দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা।

অনলাইন ডেস্ক : উত্তরাঞ্চলের সর্ববৃহৎ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা নিতে এসে বিড়ম্বনা ও হয়রানির ঘটনা নতুন নয়। দালাল থেকে শুরু করে হাসপাতালের দায়িত্বশীলদের দ্বারাও প্রতিনিয়তই রোগি ও তার স্বজদের হয়রানির শিকার হতে হয়। হয়রানির এমন অব্যাহত ধারা যেন বন্ধ হবার নয়। হাসপাতালের অভ্যন্তরের সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় করোনা মহামারীর মধ্যেও বহির্বিভাগ থেকে শুরু করে আইসিইউ ভবন সকল জায়গাতেই দালালসহ দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা। যদিও মহামারী পরিস্থিতি ও দালাল নিয়ন্ত্রণে হাসপাতাল পরিচালকের আন্তরিকতা দেশ জুড়েই প্রশংসিত হয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য মতে, সোমবার ও বুধবার বেলা ১ টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত এই নির্দিষ্ট সময় ডাক্তারদের সঙ্গে দেখা করতে পারবেন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা।
কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এমন সিন্ধান্তকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে শুক্রবার ছাড়া প্রতিদিনিই হরহামেশা ডাক্তারদের সঙ্গে দেখা করছেন তারা। অনেক সময় গভীর রাত পর্যন্ত জরুরি বিভাগে ডাক্তারদের চেম্বারের বাইরেও অবস্থান করতে দেখা যায় ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের।
রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ- হাসপাতালে এখন দালালের দৌরাত্ম অনেকটা কম থাকলেও ওষুধ প্রতিনিধিদের দৌরাত্ম কমছে না। কোনো কোনো ডাক্তার ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের সঙ্গে আড্ডাও দেন। বহির্বিভাগের রোগি দেখার সময় ডাক্তারের চেম্বারেও কেউ কেউ বসে থাকেন। কেউ আবার সকালে ডাক্তার আসলে দেখা করে বাইরে দাঁড়িয়ে থেকে রোগীদের ব্যবস্থাপত্রের ছবি তুলতে থাকেন। এরপর ঘণ্টাখানেক পরপর ডাক্তারদের জানান দিয়ে আসেন তিনি বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন।
রোগীদের অভিযোগ- অধিকাংশ সময় ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা ১০ থেকে ১২ জনের দল বেঁধে থাকেন। ডাক্তারের চেম্বার থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হুমড়ি খেয়ে পড়েন। এতে রোগিরাও ভীত থাকেন। অনেক সময় নারী-পুরুষ কোনা দিকেই লক্ষ্যই থাকে না। গায়ের সঙ্গে গা লাগিয়ে দিয়ে ছবি তুলেন। আর ছবি না তুলতে দিলেই বাঁধে বিপত্তি। গালিগালাজসহ বিভিন্ন বাজে মন্তব্যও করে।
সোনার দেশ প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে দেখা যায়, করোনার শুরু থেকেই বহির্বিভাগে রোগির চাপ অনেকটা কমতে থাকে। বাড়তে থাকে করোনা রোগী। এতে বিভিন্ন কৌশলে এসব ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা করোনা ওয়ার্ডে ডাক্তারের চেম্বারের বাইরে অবস্থান করতে থাকে। জরুরি করোনা ওয়ার্ডের বাইরেও ব্যবস্থাপত্রের ছবি তুলতে দেখা যায় তাদের। অধিকাংশ সময়ই এরা কোম্পানির কার্ড ঝুঁলিয়েই হাসপাতালে ঘোরাফিরা করে। কিন্তু আনসার সদস্যদের কখনো তাদের কিছু বলতে দেখা যায় নি। হাসপাতালের অনেক দায়িত্বশীলদের সঙ্গেও তাদের সুসম্পর্ক রয়েছে।
শনিবার (২১ আগস্ট) হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, বহির্বিভাগে রোগির চাপ বেড়েছে। অন্যান্য দিন বহির্বিভাগের বাইরে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের অধিকাংশের উপস্থিতি থাকলেও এদিন বাইরে হাতেগোনা কয়েকজন ছিলো। বাইরে থেকে দেখে হাসপাতালকে দালালমুক্ত ও ওষুধ প্রতিনিধির দৌরাত্ম্যমুক্ত মনে হয়েছে। কিন্তু ভেতরে ঢুকতেই ঠিক এর বিপরীত চিত্র দেখা যায়।
এদিন বহির্বিভাগের মেডিসিন বিভাগে সবচেয়ে বেশি ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধির দৌরাত্ম ছিলো। কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে তারা রোগির ব্যবস্থপত্রের ছবি তুলছিলো। ডাক্তারের চেম্বারের বাইরে রোগিদের বসার জন্য যে চেয়ারের ব্যবস্থা আছে তার এক-তৃতীয়ংশই এসব প্রতিনিধিদের দখলে ছিলো।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের একটি প্রত্যন্ত এলাকা থেকে মায়ের চিকিৎসার জন্য এসেছিলো সুজন আলী। তিনি জানান, সকাল থেকেই মায়ের চিকিৎসার জন্য তিনি হাসপাতালে ছিলেন। টিকিট কাটা থেকে শুরু করে ডাক্তার দেখানো পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা দাঁড়িয়ে ছিলেন। এই ভিড়ের মধ্যে একদল লোক সকাল থেকেই রোগির টিকিটের ছবি নিচ্ছিলেন। তার টিকিটের ছবি তিনবারে তিনজন নিয়েছে। কয়েকজন ভদ্র লোক বাইরে ছাড়েভালো চিকিৎসার জন্যও বলছিলো।
হাসপাতালকে রোগীবান্ধব, দালালমুক্ত, বিড়ম্বনা ও হয়রানিমুক্ত করাসহ সেবার মানোন্নয়নে কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর কারণে তা কার্যত ফল রোগিরা পাচ্ছে না। হাসপাতাল সূত্র বলছে- ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের সঙ্গে আনসার থেকে শুরু করে সকলেরই সুসম্পর্ক রয়েছে। ডাক্তারাও চায় এরা হাসপাতালে আসুক। একারণেই হাসপাতাল পরিচালক বারংবার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও এদের দৌরাত্ম্য কমছে না। এরা যাকে যেখানে যেভাবে ম্যানেজ করতে হয় করে। আর ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা অধিকাংশই শিক্ষিত। সুতরাং তাদের কৌশলও অনেক। ডাক্তারকে দেয়া সুবিধার বিনিময়ে তারা কতটুকু পাচ্ছে সেটা তারা ঠিকিই বুঝে নেয়।
এ বিষয়ে রামেক হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানি জানান, হাসপাতাল দালালমুক্ত ও ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের দৌরাত্মমুক্ত করতে তিনি সচেষ্ট আছেন। কিন্তু হাসপাতালের ডাক্তার, আনসার অনেকেই চায় তারা আসুক। এরা প্যাড, কলম, ওষুধসহ অন্যান্য সুবিধা দিয়ে অনেককেই ম্যানেজ করছে। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কখনোই এদের প্রশয় দিবে না। তারা সপ্তাহে দুই দিন একটি নির্দিষ্ট সময় হাসপাতালে আসতে পারবে। চিকিৎসা কাজে তারা কোনো ব্যাঘাত ঘটাতে পারবে না। কিন্তু এটা ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা মানছেন না। তাদেরকে বারবার অপমান করার পরও তারা আসছেন।
পরিচালক আরও জানান, হাসপাতালে এখন বাউন্ডারি ওয়ালের কাজ চলমান। একারণে তারা যে কোনো দিক দিয়ে হাসপাতালে ঢুকছে। তবে সামনের দিনে এদেরকে হাসপাতালে প্রবেশে আরও কঠোর হতে হবে। কোনো অবস্থাতেই এই নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে তারা হাসাপাতালে থাকতে পারবে না।

SHARE