নেশা ঠেকাতে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন

31

মোঃ তৌহিদুজ্জামান : খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, আমাদের দেশে সরকারি-বেসরকারি অফিসে তখন অফিস প্রধান বা কর্মকর্তাদের টেবিলে শোভা পেত অ্যাশট্রে নামক একটি বস্তু। এখন সরকারি অফিস তো বটেই, এমনকি বেসরকারি অফিসেও অ্যাশট্র্রের উপস্থিতি বিরল। এ পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে মূলত ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫ (২০১৩ সালে সংশোধিত) পাশের ফলে। কারণ পাবলিক প্লেসে ধূমপান নিষিদ্ধ করে জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে আইনটিতে।

আইনটি পাশের আগে অধূমপায়ীদর জন্য পাবলিক পরিবহনে ভ্রমণ ছিল একটি বড় বিড়ম্বনা। তখন অসংখ্য মানুষ ট্রেন বা বাসের মধ্যেই ধূমপান করতেন। তাদের নিষেধ করলে, ব্যক্তিগত গাড়ি বা প্রাইভেট কার ভাড়া করে ভ্রমণের পরামর্শ পাওয়া যেত উক্ত ধুমপায়ীর নিকট থেকে। দুই একটা ব্যতিক্রম বাদ দিলে, এখন পাবলিক পরিবহনে ধূমপান হয় না বললেই চলে। এ পরিবর্তনও সম্ভব হয়েছে ওই আইনটির কারণেই কারণ সেখানে পাবলিক প্লেসের সাথে সাথে পাবলিক পরিবহনেও ধূমপান নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তাই এখন যখনই পাবলিক পরিবহনে ধূমপান তখনই প্রতিরোধ।

পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহনে ধূমপান বন্ধ হওয়ার বিষয়টি আমাদের স্বস্তি দিলেও তাতে আমাদের উদ্বেগ শতভাগ দূরীভূত হয়নি। কেননা এই দুই স্থানে ধুমপান কমে আসলেও আমদের দেশের ধুমপায়ীর মোট সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে তেমনটা বলার সুযোগ নেই। বরং সম্প্রতি জাপান টোব্যাকো বলেছে, বাংলাদেশ বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম সিগারেটের বাজার এবং প্রতি বছর এটা ২% হারে বাড়ছে।

ধুমপানকে আপাত নিরীহ মনে হলেও বিশেষজ্ঞরা বলেন ধুমপানই মাদক সেবনের প্রবেশদ্বার। ধূমপান প্রতিরোধের সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে তামাকজাত পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া। কিন্তু অতি বাস্তবতার কারণেই আমাদের দেশে সেটা এখনই সম্ভব নয়। তামাক চাষ ও বিপননের উপর এদেশে একটা বড় সংখ্যক মানুষের জীবিকা নির্ভরশীল। বাংলাদেশ তামাক চাষকৃত এলাকার আয়তনের দিক থেকে পৃথিবীর চতুর্দশ স্থানে রয়েছে, আর তামাক উৎপাদনের পরিমাণের দিক থেকে তার স্থান বিশ্বে দ্বাদশ । বৈশ্বিক তামাকের ১.৩% যোগানদাতা বাংলাদেশ। দেশে ব্যবহৃত তামাকের মোট মূল্য ৩০,৫০০ কোটি টাকা যা ২০১৮ সালের হিসাব অনুসারে জিডিপির ১.৪%। শুধু সিগাটের বাজারই ২০,০০০ কোটি টাকার বেশি যা ক্রমাগত বাড়ছে। সরকারের বড় অঙ্কের রাজস্ব প্রাপ্তির বিষয়টাতো আছেই।

এত সব বাস্তবতায় এখনই দেশে তামাক উৎপাদন ও বিপনন বন্ধ হবে তেমনটি আশাকরা সমীচীন হবে না। কৃষককে বিকল্প অর্থকরী ফসলের সন্ধান দিতে পারলে এবং তার বিপননের ব্যবস্থা করে দিলে হয়তো একসময় দেশে তামাক উৎপাদন ও বিপনন বন্ধ করা সম্ভব হবে। কিন্তু সেদিনের অপেক্ষায় বসে থাকার সুযোগ কোথায়? সে অপেক্ষায় থকেলে নেশার প্রবেশ দ্বার উন্মুক্ত থাকার সুযোগে আমাদের কিশোর-তরুণ প্রজন্ম মাদকের মরণ নেশাতে নিমজ্জিত হয়ে পড়বে।

সকল ধুমপায়ী মাদকাশক্ত হবে তেমনটা কথা নয়, তবে সকল মাদকসেবী যে ধুমপানের মাধ্যমে তাদের যাত্রা শুরু করে এটা বলা সহজ। কোন কোন গবেষণা বলছে যে, আমাদের দেশের ৯৮% মাদকসেবী ধুমপানের মাধ্যমে এক সময় মাদকে জড়িয়ে পড়েছে। আমরা যদি উল্টোভাবে চিন্তা করি তাহলে দেখব, ধুমপান না করলে আমাদের মাদকাশক্ত হওয়ার সম্ভাবনা ২% বা নেই বললেই চলে। কিশোর ও তরুণ (১২ বছর-১৮ বছরের মধ্যে) বয়সে যে ধূমপান করেনি পরিণত বয়েসে সে হঠাৎ মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েছে এমনটা দেখা যায় না। এমনকি পরিণত বয়সে তার ধুমপায়ী হওয়ার সম্ভাবনাও অনেকাংশেই কমে যায়।

তামাক সেবন মাথার চুল থেকে পায়ের নখ, শরীরের এমন কোন অঙ্গ নেই যার ক্ষতি সাধন করেনা। তামাক সেবীদের ৫০% এর মৃত্যু ঘটে তামাকের কারণেই। এর বাইরে যেটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে, ধুমপান মাদককে টেনে আনে। যতদিন পর্যন্ত আমাদের দেশে তামাক বিক্রয় নিষিদ্ধ না হচ্ছে, ততোদিন কিশোর-তরুণদেও ধুমপান থেকে দূরে রাখার এক্ষেত্রেও অনেকটা সহায়ক ২০১৩ সালে সংশোধিত ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫। আইনটিতে নতুন ধারা ৬ক সন্নিবেশ করে বলা হয়েছে যে, (১) কোন ব্যক্তি অনধিক আঠারো বছর বয়সের কোন ব্যক্তির নিকট তামাক বা তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয় করবেন না, অথবা উক্ত ব্যক্তিকে তামাক বা তামাকজাত দ্রব্য বিপণন বা বিতরণ কাজে নিয়োজিত করবেন না বা করাবেন না। (২) কোন ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এর বিধান লঙ্ঘন করলে তিনি অনধিক পাঁচ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন এবং উক্ত ব্যক্তি দ্বিতীয় বার বা পুনঃ পুনঃ একই ধরনের অপরাধ সংঘটন করলে তিনি পর্যায়ক্রমিকভাবে উক্ত দণ্ডের দ্বিগুণ হারে দণ্ডনীয় হবেন।” ।

পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহনে ধূমপান নিষিদ্ধের বিষয়টি কার্যকরে আমরা যেরূপ সোচ্চার হয়েছিলাম, তেমনিভাবেই অপ্রাপ্ত বয়স্কদের কাছে সিগারেট বিক্রয়ের বিষয়েও সোচ্চার হতে হবে। এক্ষেত্রে ৬ক ধারাতে বেশি বেশি মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন। আমরা এ আইনে পাবলিক প্লেস/পরিবহনে ধুমপান এবং বিজ্ঞাপনের বিধি-নিষেধ না মানার অভিযোগেই শুধু মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হতে দেখি। আপ্রাপ্ত বয়স্কদের নিকট সিগারেট বিক্রয়ের জন্য মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হতে দেখি না। আপ্রাপ্ত বয়স্কদের নিকট সিগারেট বিক্রয়ের জন্য মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হলে, তা অভিভাবকদের সাহস যোগাবে এবং তারা এ বিষয়ে সোচ্চার হতে উৎসাহিত হবে। তবেই আমরা আমাদের কিশোর-তরুণদের প্রথমে ধুমপান সেই সাথে মাদকসেবী হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারব। – লেখক : উপপ্রধান তথ্য অফিসার আঞ্চলিক তথ্য অফিস, রাজশাহী ।

SHARE