পুঠিয়ায় সুদের ফাঁদে জিম্মি হাজারো পরিবার

55

পুঠিয়া প্রতিনিধি : পুঠিয়ায় দু শতাধিক শীর্ষ সুদব্যবসায়ী চক্রের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন হাজারো পরিবার। এছাড়া মাঝারি সুদ ব্যবসায়ী আছে আরও ৫ শতাধিক। আর সবচেয়ে বেশি সুদের টাকা লেন-দেন হয় উপজেলার ধোপাপাড়া বাজারে। পরের স্থান ঝলমলিয়া বাজার, মোল্লাপাড়া হাট ও বানেশ্বর হাটের নাম বেশি শোনা যায়।

সুদ ব্যবসায়ীরা এলাকার সাধারণ খেটে খাওয়া দিনমুজুর, প্রান্তিক কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের টার্গেট করছে। কেউ টাকা নিতে চাইলে জমির দলিল জমা রেখে সাদা স্ট্যাম্পে একটি চুক্তিপত্র করে। এরপর তারা স্ট্যাম্পে একাধিক স্বাক্ষর করিয়ে ইচ্ছেমত সুদের পরিমান লিখে ভুক্তভোগিদের জিম্মি করে রাখছে। সুদ ব্যবসায়ীদের ফাঁদে পড়ে গত কয়েক বছরে আত্মহত্যা করেছেন বানেশ্বর এলাকায় দু’জন, জিউপাড়া ও শিলমাড়িয়া এলাকায় ৫ জন। এছাড়া শেষ সম্বল ভিটেবাড়ি বিক্রি করে পথে বসেছে ও পালিয়ে বেড়াচ্ছে শতাধিক পরিবার।

আরিফুল ইসলাম একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বলেন, ব্যবসার পরিধি বাড়াতে সুদের ওপর ৫ লাখ টাকা নেয় আরিফুল ইসলাম। তিন বছরে ওই ৫ লাখ টাকার সুদ দেয়া হয়েছে প্রায় ৩০ লাখ টাকা। গত বছরের শুরুতে করোনা পরিস্থিতিতে তার ব্যবসায় চরম মন্দা শুরু হয়। যার কারণে তিনি সময়মত টাকা দিতে ব্যর্থ হন। সম্প্রতি ওই সুদ ব্যবসায়ী তার কাছে আরও ৩৬ লাখ টাকা দাবি করে। আর টাকা দিতে না পারলে তার পরিবারকে বিভিন্ন ভাবে হুমকি দেয়া শুরু হয়। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানা পুলিশ পর্যন্ত গড়িয়েও এর কোনো সরাহা হয়নি। এক পর্যায়ে তিনি আত্নরক্ষার্থে গত কয়েক মাস থেকে পলাতক রয়েছেন।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে ঝলমলিয়া বাজার এলাকার অপর এক কীর্টনাশক ডিলার বলেন, স্থানীয় তিনজন সুদ ব্যবসায়ী নিকট থেকে ২০ লাখ টাকা নেয়। তিন’বছরে ওই টাকার সুদ দেয় ৫০ লাখ টাকা। এখনো সুদসহ তার দেনা প্রায় এক কোটি টাকা। অপরদিকে চকদোমাদি গ্রামের রফিকুল আলম দু’লাখ টাকার সুদ পরিশোধ করতে ৭ বিঘা ধানি জমি বিক্রি করেছেন। গ্রামের মধ্যে ১০ টি লিজ পুকুর অল্প দরে ছেড়ে দিতে হয়েছে। এক পর্যায়ে তার স্ত্রী সংসারে অভাবের তাড়নায় তিন সন্তান ফেলে তাকে ছেড়ে চলে গেছে। বর্তমানে রফিকুল পাগল হয়ে পথে পথে ঘুরছেন।

সাতবাড়িয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ফারুক হোসেন বলেন, সুদ ব্যবসায়ীদের ফাঁদে শিলমাড়িয়া ও জিউপাড়া ইউনিয়ন এলাকার অনেক মানুষ জিম্মি হয়ে পড়েছেন। সময়মত টাকা দিতে না পারায় সুদ ব্যবসায়ীদের অত্যাচারে অনেকেই রাতারাতি গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। আবার সুদের টাকা পরিশোধ করতে না পেরে গত কয়েক বছরে ৫ জন আত্মহত্যাও করেছে।

জিউপাড়া ইউনিয়নের একজন ইউপি সদস্য বলেন, উপজেলার মধ্যে সুদ ব্যবসার বেশি ধোপাপাড়া ও ঝলমলিয়া বাজার। এখানে ৪০ থেকে ৪৫ জন শীর্ষ সুদখোর রীতিমত অফিস খুলে প্রকাশ্যে তাদের ব্যবসা করছে। কেউ বিপদে পড়ে তাদের নিকট থেকে একবার টাকা নিলে রাতারাতি তার সুদ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। আর ভুক্তভোগী ওই টাকা পরিশোধ করতে জমিজমা বিক্রি করে পথে বসে যায়। সময়মত টাকা দিতে না পারলে সুদ ব্যবসায়ীদের লোকজন ভুক্তভোগীদের ধরে এনে গোপন ঘরে নির্যাতন চালায়।

এ ব্যাপারে উপজেলা চেয়ারম্যান জিএম হীরা বাচ্চু বলেন, কিছু অসহায় মানুষের সরলতার সুযোগে সুদ ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম অনেক বেড়েছে। উভয়পক্ষ গোপন চুক্তির মাধ্যমে টাকা-পয়সা লেন-দেন করছে। হাতে গোনা দু’একটি বিষয় প্রকাশ্যে আসলেও বেশির ভাগ ঘটনা থেকে যায় গোপনে। যার কারণে ওই সুদ ব্যবসায়ীরা ধরাছোঁয়ার বাহিরে থেকে যায়। সুদের বিষয় গুলো থানা ও প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে। কোনো ভুক্তভোগী আমাদেরকে অভিযোগ করলে অব্যশই তা আইনগত ভাবে মোকাবেলা করা হবে।

SHARE