নওগাঁর সদর আসনে নতুন মুখ নিজাম উদ্দিন জলিল জন

295

নওগাঁ প্রতিনিধি : সারা দেশে বইছে সংসদ নির্বাচনের হাওয়া। কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে দৌড়-ঝাঁপ করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন অনেক মনোনয়ন প্রত্যাশিরা। সব জল্পনা কল্পনাকে অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের দলীয় প্রার্থীদের প্রাথমিক মনোনয়ন প্রদান করেছে। মনোনয়নে পরিবর্তন এসেেছ নওগাঁ সদর আসনে।
নওগাঁ-১: নওগাঁ জেলার পশ্চিমে ভারত সীমান্ত ঘেষা বরেন্দ্র অঞ্চলজুড়ে অবস্থিত পোরশা, সাপাহার ও নিয়ামতপুর উপজেলা। এই তিন উপজেলা নিয়ে গঠিত নওগাঁ-১ আসন। জাতীয় সংসদের নির্বাচনী এলাকা আসন নম্বর ৪৬।
বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এ আসনটি আওয়ামীলীগের দখলে যায় নবম সংসদ নির্বাচনে। পর পর দুইবার বিএনপি ক্ষমতায় না থাকায় বর্তমানে পাল্টে গেছে এই আসনের ভোটের হিসাব-নিকাশ। বর্তমান সরকারের বদৌলতে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক বাবু সাধন চন্দ্র মজুমদার প্রত্যন্ত অবহেলিত এই অঞ্চলে ছড়িয়ে দিয়েছেন উন্নয়নের ছোঁয়া। আধুনিক মান সম্মত যোগাযোগ ব্যবস্থা এই অঞ্চলে দৃশ্যমান উন্নয়ন যা এই অঞ্চলের মানুষের কাছে ছিলো স্বপ্ন।
জেলার তিনটি উপজেলাই বরেন্দ্রভূমি। এখন উপজেলাগুলোতে লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। গ্রামে গ্রামে জ্বলছে বৈদ্যুতিক বাতি। সড়কের উন্নয়ন হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থাও হয়েছে আগের তুলনায় অনেক সহজতর ।
এ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৮৬ হাজার ৯ শ ২৯জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার এক লাখ ৯১ হাজার ৫২ জন এবং নারী ভোটার এক লাখ ৯৫ হাজার ৯২৭ জন।
নির্বাচনী এলাকা ঘুরে জানা গেছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে নওগাঁ-১ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে কোন প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থী না থাকায় বর্তমানে আ’লীগের অবস্থান খুবই শক্তিশালী। অপরদিকে বিএনপি ও জাতীয় পার্টির মনোনয়ন প্রত্যাশিদের উপস্থিতি বৃদ্ধি পেয়েছে।
২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা বাবু সাধন চন্দ্র মজুমদার বিপুুল ভোটের ব্যবধানে তিনবারের নির্বাচিত বিএনপির সংসদ সদস্য ডা. ছালেক চৌধুরীকে পরাজিত করেন। এরপর দশম সংসদ নির্বাচনেও বাবু সাধন চন্দ্র মজুমদার জয়লাভ করেন।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নওগাঁ-১ আসনে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন নওগাঁ জেলা সাধারণ সম্পাদক ও ধর্ম মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য বাবু সাধন চন্দ্র মজুমদার।
নওগাঁ-২: জাতীয় সংসদের নির্বাচনী আসন নম্বর ৪৭ ও নওগাঁ জেলার পতœীতলা ও ধামইরহাট এই দুই উপজেলা নিয়ে গঠিত নওগাঁ-২ আসন। বিশাল আয়তনের এই দুই উপজেলাই ভারত সীমান্ত ঘেষা। উন্নত মানের ধান উৎপাদনে ও কৃষি ভিত্তিক অর্থনীতির উপজেলা দুইটিতে আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুনরুদ্ধারে বিএনপি আর ধরে রাখার লড়াইয়ে আওয়ামীলীগকে ভোট যুদ্ধে নামতে হবে।
পতœীতলা-ধামইরহাট দুই উপজেলায় ভোটারের সংখ্যা মোট ৩লাখ ১৭হাজার ৭শ ২৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১লাখ ৫৯হাজার ২৮ জন এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৫৮ হাজার ৬ শ ৯৮ জন। পতœীতলা উপজেলায় পুরুষ ভোটার ৮৮হাজার ৭শ এবং নারী ভোটার ৮৮ হাজার ৫শ ৫ জন। ধামইরহাট উপজেলায় পুরুষ ভোটার ৭০হাজার ৩শ ২৮ জন এবং নারী ভোটার ৭০ হাজার ১ শ ৯৩ জন।
এ আসনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগের মনোনয়ন পেয়েছেন বর্তমান জাতীয় সংসদের হুইপ শহীদুজ্জামান সরকার বাবলু এমপি। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে শহীদুজ্জামান সরকার প্রথমবার এ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। আবার নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বিএনপির দলীয় প্রার্থী শামসুজ্জোহা খানকে পরাজিত করে দ্বিতীয়বারের মত সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে তিনি জাতীয় সংসদের হুইপ নির্বাচিত হন।
নওগাঁ-৩: নওগাঁ-৩ বদলগাছী-মহাদেবপুর আসনটি জাতীয় সংসদের ৪৮ নম্বর নির্বাচনী এলাকা।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন বর্তমান সংসদ সদস্য মো. ছলিম উদ্দীন তরফদার (সেলিম)। জানা গেছে, নওগাঁ-৩ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা তিন লাখ ৭৮ হাজার ১৮ জন। হালনাগাদ করার পর এ সংখ্যা আরো বাড়বে বলে নির্বাচন অফিস থেকে জানানো হয়েছে।
মহাদেবপুর উপজেলার েেরাগপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন বর্তমান সংসদ সদস্য ছলিম উদ্দীন তরফদার। তিনি ছিলেন ওই উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। দশম সংসদ নির্বাচনে দলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ায় তাকে আওয়ামীলীগ দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। অবশ্য পরে তাকে সদস্য পদ ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে বিজয়ী হয়ে প্রথম দিকে সংসদ সদস্য ছলিম উদ্দীন তরফদারকে অনেক সমস্যা মোকাবেলা করতে হয়েছে। পরে তাকে দলীয় সদস্য পদ ফিরিয়ে দিলে সেই সমস্যা থেকে মুক্তি পান সংসদ সদস্য ছলিম উদ্দিন তরফদার। সংসদ সদস্য হওয়ার পর এই চার বছরেই তার ব্যাপক বিত্ত বৈভব চোখে পড়ার মত।
নওগাঁ-৪: নওগাঁ জেলার বৃহত্তম উপজেলা মান্দা। ১৪টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই উপজেলায় মোট ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৮৭হাজার ৭৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৪১হাজার ২৩ ও নারী ভোটার ১ লাখ ৪৬হাজার ৫১ জন।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগের মনোনয়ন পেয়েছেন বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকারের বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী মুহা. ইমাজ উদ্দিন প্রামানিক এমপি।
ইমাজ উদ্দিন প্রামানিক বর্তমান সরকারের বস্ত্র ও পাট মন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর এলাকায় তেমন সময় দিতে পারেন না। সেই সঙ্গে তার শারীরিক অবস্থাও খারাপ। এই সুযোগে মান্দা এলাকার হাতে গোনা গুটি কয়েক নেতা কর্মীর মাধ্যমে দলীয় কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে তার দলীয় ভাবমূর্তি অনেকটাই প্রশ্নের মুখে। এখানে আ’লীগের দলীয় কোন্দলের কারণে নষ্ট হয়ে গেছে আ’লীগের ভাবমূর্তি।
নওগাঁ-৫: নওগাঁ জেলায় প্রবেশের মুখেই নওগাঁ সদর। এরশাদ সরকারের শাসনামলে ১৯৮৪ সালে মহকুমা শহর থেকে জেলায় উন্নীত হয় নওগাঁ। এরপর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে নওগাঁ জেলা সদরের পরিধি। জেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নওগাঁ-৫ সদর আসন। জাতীয় সংসদের নির্বাচনী আসন নম্বর ৫০।
১২টি ইউনিয়ন পরিষদ এবং ১টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত নওগাঁ সদর উপজেলা নওগাঁ সদর-৫ আসন। এখানে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ১৩ হাজার ৯৪৭ জন। এদের মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৫৭ হাজার ৩২০ জন এবং নারী ১ লাখ ৫৬ হাজার ৬২৭ জন। পৌর এলাকার ভোটার সংখ্যা ১ লাখ ১২ হাজার ৮০২ জন। এরমধ্যে ৫৬ হাজার ২৪৬ জন পুরুষ এবং ৬৫ হাজার ৫৫৬ জন নারী ভোটার।
বিএনপি’র ঘাঁটি বলে খ্যাত নওগাঁয় নওগাঁ সদর আসনসহ তাদের ধস নামে ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে। ২০০১ সালের নির্বাচনে নওগাঁ-৫ সদর আসনে নির্বাচিত হন বর্ষীয়ান নেতা বাংলাদেশ আ’লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক বাণিজ্য মন্ত্রী মো. আবদুুল জলিল।
২০১৩ সালের মার্চে নওগাঁর বর্ষীয়ান নেতা সাবেক বাণিজ্য মন্ত্রী আবদুল জলিল এমপি’র মৃত্যুর পর নওগাঁয় দলের হাল ধরেন দীর্ঘদিনের সাধারণ সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুল মালেক। উপ-নির্বাচনে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রথমবারের মত সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে তিনি জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি মো. রফিকুল ইসলাম রফিকের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়লাভ করেন। আবদুল মালেক বর্তমানে সদর আসনের এমপি ছাড়াও জেলা আওয়ামী লীগের নির্বাচিত সভাপতি।
অপরদিকে আবদুল জলিলের ছেলে নওগাঁ জেলা আওয়ামীলীগের যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার নিজাম উদ্দিন জলিল জন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকার মনোনয়ন প্রত্যাশি। তরুণ ও নতুন মুখ হিসেবে নওগাঁ সদর আসনের মানুষ চেয়ে আছেন জনের দিকে। আবদুল জলিল শুধু নওগাঁর নেতা ছিলেন না তিনি সারা বাংলাদেশের জন্য দলবল নির্বিশেষে একজন নিবেদিত প্রাণ ছিলেন। তাই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতিককে বিপুল ভোটে জয়ী করে জনকে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত করে নওগাঁ সদর আসনের হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনতে চায় নওগাঁ সদর আসনের সাধারণ মানুষরা।
নওগাঁ জেলা আওয়মীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাংসদ সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেন, সাবেক বাণিজ্য মন্ত্রী আবদুল জলিলের ব্যংক ঋণ থাকায় নিজাম উদ্দিন জলিল জনের মনোনয়ন নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা দেখা দেয়ায় এ আসনে মুক্তিযোদ্ধা সাংসদ আবদুল মালেক ও নওগাঁ জেলা আওয়ামীলীগের যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার নিজাম উদ্দিন জলিল জনকে মনোনয়নের চিঠি দেয়া হয়েছে কেন্দ্র থেকে। তবে কোনো সমস্যা না হলে এ আসনে নৌকার মনোনয়ন নিজাম উদ্দিন জলিল জনের মনোনয়ন চূড়ান্ত।
নওগাঁ-৬: নওগাঁ জেলার রাণীনগর ও আত্রাই দুই উপজেলা নিয়ে নওগাঁ-৬ ও জাতীয় সংসদের ৫১ নম্বর আসনটি গঠিত। এক সময়ের রক্তাক্ত জনপদ হিসেবে খ্যাত ছিলো এই আত্রাই-রাণীনগর উপজেলা। এই আসনে মূলতঃ ভোটের লড়াই হবে প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামীলীগ ও বিএনপি’র প্রার্থীর মধ্যেই। আ’লীগের প্রার্থী চূড়ান্ত হলেও দ্বিধায় রয়েছে বিএনপি। এই আসনে ৩য় বারের মতো নৌকার মাঝি হলেন জেলা আ’লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় ফেডারেশনের সভাপতি ও বর্তমান সংসদ সদস্য মো. ইসরাফিল আলম। নওগাঁ-৬ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা তিন লাখ ৯ হাজার ৩৯৭ জন।
এ আসনে ১৪দলের মনোনয়ন পেয়েছেন বর্তমান সংসদ সদস্য মো. ইসরাফিল আলম। তিনি বলেন, আমি গত ২০০৮ সালে বিএনপি’র দলীয় প্রার্থী আনোয়ার হোসেন বুলুকে পরাজিত করে ও সর্বহারা-জেএমবিদের মোকাবেলা করে প্রথম বারের মত সংসদ সদস্য নির্বাচিত হই। পরে ২০১৪ সালের ৫জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আবারো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হই। এই জনপদের মানুষের প্রাণের দাবি ছিলো এই জনপদকে সর্বহারা-জেএমবি মুক্ত করে শান্তির বাতাস বয়ে আনা যা আমি নিজের প্রাণ বাজি রেখে করতে সক্ষম হয়েছি। এখন এই জনপদে শান্তির সুবাতাস বইছে। আমি গত ৯ বছরে বর্তমান সরকারের সহযোগিতায় এলাকার যোগাযোগের ক্ষেত্রে বেশ ভাল অবদান রাখার চেষ্টা করেছি। নাগর নদীর উপর দুটি ব্রিজ, আত্রাই নদীর উপর একটি ব্রিজ, ছোট যমুনা নদীর উপর দুটি ব্রিজ এলাকায় যোগাযোগের ক্ষেত্রে বড় ধরনের উন্নয়ন হয়েছে। এ ছাড়াও আমি রাস্তা-ঘাট ও শিক্ষা ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব উন্নয়ন করেছি। রাণীনগর-আত্রাইবাসীর প্রাণের দাবি ছিল পতিসরে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের। কিন্তু কোন ভাবেই সেই দাবি পুরুণ হয়নি। তবে পতিসরে একটি কৃষি ইনস্টিটিউট স্থাপিত করেছি যে উন্নয়নগুলো কথা এই জনপদের মানুষ কখনো ভাবেনি।

SHARE