বিকল্প রেখে পুরনোতেই ভরসা বিএনপির

176

গণধ্বনি ডেস্ক : একাদশ সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নে অধিকাংশ আসনে ‘বিকল্প প্রার্থী’ রেখে পুরনোদের ওপরই আস্থা রাখছে বিএনপি। দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন করায় নবম সংসদ নির্বাচনের প্রায় সব প্রার্থী ও সাবেক সংসদ সদস্যরাই এবারও দলীয় মনোনয়ন পাচ্ছেন। দশ বছর পর জাতীয় নির্বাচনের ভোটযুদ্ধে লড়তে গতকাল সোমবার দলীয় প্রার্থীদের ধানের শীষ প্রতীকের মনোনয়ন দেওয়া শুরু করেছে বিএনপি। প্রথম দিনে রংপুর, রাজশাহী, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের (আংশিক) শতাধিক আসনে দেড় শতাধিক দলীয় প্রার্থীর প্রাথমিক মনোনয়নের চিঠি দিয়েছে দলটি। এরমধ্যে কিছু আসন পুরনো মিত্র ২০ দলীয় জোট এবং নতুন মিত্র জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের জন্য খালি রাখা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার বাকি সব বিভাগের দলীয় ও দুই জোটের শরিকদের মনোনয়নের চিঠিও দেওয়া হবে।

চার বিভাগের বেশিরভাগ আসনেই দু’জন এবং তিনজন বিকল্প প্রার্থী রেখেই মনোনয়নের প্রাথমিক চিঠি দেওয়া হয়েছে। অবশ্য অনেক পুরনো নেতারা স্ত্রীকেই বিকল্প প্রার্থী হিসেবে রেখেছেন। সংস্কারপন্থি হিসেবে পরিচিত নেতাদের অনেকেই মনোনয়নের চিঠি পেয়েছেন। প্রবীণ নেতাদের মধ্যে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক স্পিকার জমিরউদ্দিন সরকার, স্থায়ী কমিটির অপর সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান এবং সাবেক সংসদ সদস্য কবির হোসেন বয়োবৃদ্ধ ও অসুস্থতার কারণে এবার মনোনয়ন নেননি। অবশ্য জমিরউদ্দিনের পঞ্চগড়-১ আসনে তার ছেলে ব্যারিস্টার নওশাদ জমিরকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের মতো দুই জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী কনকচাঁপা সিরাজগঞ্জ-১ আসন এবং বেবী নাজনীনকে নীলফামারী-৪ আসনে মনোনয়নে চমক দিয়েছে বিএনপি।

মনোনয়নের চিঠি দেওয়া উপলক্ষে গতকাল সকাল থেকে বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ের সামনে মনোনয়নপ্রত্যাশী ও বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী ভিড় করেন। বিকেল সাড়ে ৪টায় তিন আসনে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মনোনয়নের চিঠি হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে ধানের শীষের প্রার্থীদের প্রত্যয়নপত্র দেওয়া শুরু করে বিএনপি। কারাবন্দি খালেদা জিয়ার মনোনয়নের চিঠি সোমবার  তার নির্বাচনী এলাকার প্রতিনিধির হাতে তুলে দেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দুর্নীতির দুই মামলায় ১৭ বছরের সাজায় কারাগারে থাকা খালেদা জিয়া এবার মনোনয়ন নিয়েছেন ফেনী-১, বগুড়া-৬ ও বগুড়া-৭ আসন থেকে। বগুড়ার দুটি আসনে তার পক্ষে জেলা বিএনপির সভাপতি সাইফুল ইসলাম এবং চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য হেলালুজ্জামান তালুকদার লালু মহাসচিবের কাছ থেকে প্রত্যয়নপত্র গ্রহণ করেন। নির্বাচন কমিশনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় দলীয় মনোনয়নের এই প্রত্যয়নপত্রও জমা দিতে হবে।

খালেদা জিয়া কারাগারে এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিদেশে থাকায় এই প্রত্যয়নপত্র দেওয়া হচ্ছে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের স্বাক্ষরে। গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে প্রত্যয়নপত্র হস্তান্তরের আগে বক্তব্য দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন মির্জা ফখরুল।

সংবাদ সম্মেলনের পর বিকেল ৪টা থেকে বরিশাল বিভাগে ধানের শীষের মনোনীত প্রার্থীদের প্রত্যয়নপত্র দেওয়া শুরু হয়। এরপর সন্ধ্যা ৬টা থেকে রংপুর বিভাগের এবং রাত ৮টা থেকে রাজশাহী বিভা এবং পরে চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু জেলায় প্রার্থীদের প্রত্যয়নপত্র দেওয়া হয়।

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব বলেন, নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে আমরা প্রত্যেকটি আসনে দু’জন করে প্রার্থীকে প্রাথমিক মনোনয়ন দিচ্ছি। কোনো কারণে একজনের না হলে পরেরজন যাতে সুযোগ পান। আর আমাদের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ যেখানে যারা আছেন, সেখানে তারাই মনোনয়ন পেয়েছেন। নির্বাচনী আইন অনুযায়ী প্রাথমিক মনোনয়নের ক্ষেত্রে এক আসনে একাধিক প্রার্থীকে প্রত্যয়ন দেওয়ার সুযোগ থাকলেও প্রতীক বরাদ্দের আগে দলের পক্ষ থেকে মনোনয়নের চূড়ান্ত তালিকা নির্বাচন কমিশনে জমা দিতে হয়। সেখানে যাদের নাম থাকবে, কেবল তারাই শেষ পর্যন্ত ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হবেন। বাকিদের মনোনয়নপত্র বাদ যাবে।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের পাশাপাশি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত ঐক্যফ্রন্ট এবার ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ভোট করার ঘোষণা দিয়েছে। তবে বিএনপি কতটি আসনে নিজেদের প্রার্থী দিচ্ছে আর কতটি আসন জোট শরিকদের জন্য ছাড়ছে- সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা এখনও আসেনি। তবে পুরনো মিত্র ও নতুন মিত্র দুই জোটকে ৬০টি আসন ছাড়বে বলে আভাস পাওয়া গেছে। এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামী ২৫টিসহ ২০ দলকে ৪২টি আসন এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে ১৮টি আসন দেওয়ার ব্যাপারে দরকষাকষি চলছে।

বরিশালে ২১টি আসনের মধ্যে ভোলা-১, পিরোজপুর-২ জোটের শরিকদের জন্য খালি রাখা হয়েছে। বাকি ১৮টি আসনের মধ্যে তিনটি আসনেই শুধু পুরনোদের একক মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। বাকি সব আসনেই বিকল্প প্রার্থী রাখা হয়েছে।

রাজশাহী বিভাগের মধ্যে বগুড়া-২ ও ৪, সিরাজগঞ্জ-৪, পাবনা-১, রংপুর বিভাগের লালমনিরহাট-২, ঠাকুরগাঁও-২ ও ৩ আসন জোটের শরিকদের জন্য খালি রাখা হয়েছে। এ ছাড়া গাইবান্ধা জেলার পাঁচটি আসনে মনোনয়ন ঘোষণা বাকি রয়েছে। এ দুই বিভাগে ২০টি আসনে একক প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে।

সংস্কারপন্থিরাও মনোনয়ন পেয়েছেন : দলে ফিরিয়ে আনা সংস্কারপন্থি হিসেবে পরিচিত নেতাদের অবশ্য প্রথম এবং দ্বিতীয় বিকল্প প্রার্থী রেখে মনোনয়নের চিঠি দেওয়া হয়েছে। সাবেক প্রতিমন্ত্রী আলমগীর কবিরকে নওগাঁ-৫, সাবেক হুইপ শহীদুল হক জামালকে বরিশাল-২, সাবেক এমপি জহিরউদ্দিন স্বপনকে বরিশাল-১ আসনে, বগুড়া-৫ জিএম সিরাজ, ঝালকাঠি-২ ইলেন ভুট্টো, বরগুনা-২ নূরুল ইসলাম মনি, পটুয়াখালী-২ আসনে শহীদুল আলম তালুকদারকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া দলের শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে সমালোচনা করে বক্তব্য দেওয়ায় বহিস্কৃত নেতা আবু হেনাকে রাজশাহী-৪ আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে বহিস্কৃত সাবেক সংসদ সদস্য ফজলুল আজিমকে নোয়াখালী-৬ আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।

রাজশাহী বিভাগে বাদপড়া মুখ : তিন বয়োবৃদ্ধের বাইরে নবম সংসদে মনোনয়নপ্রাপ্ত আরও কয়েকজন নেতা এবার মনোনয়নবঞ্চিত হয়েছেন। তারা হলেন- রাজশাহী-৬ আসনে এ আজিজুর রহমান বাদ পড়েছেন। নাটোর-৩ কাজী গোলাম মোর্শেদ, নাটোর-৪ মোজাম্মেল হক, বগুড়া-২ এ কে এম হাফিজুর রহমান ও বগুড়া-৪ আসনে ইঞ্জিনিয়ার জেড আই এম মোস্তফা আলীসহ অনেকে বাদ পড়েছেন।

মৃত্যুবরণকারী নেতাদের আসনে স্ত্রী ও সন্তান : মৃত্যুবরণকারী নেতাদের আসনে স্ত্রী ও সন্তানকেও মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। নওগাঁ-৩ আসনে সাবেক ডেপুটি স্পিকার মরহুম আখতার হামিদ সিদ্দিকীর ছেলে আরিফিন সিদ্দিকী জনিকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। অবশ্য বিকল্প হিসেবে রবিউল আলম বুলেটকে রাখা হয়েছে। সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মরহুম ফজলুর রহমান পটলের নাটোর-১ আসনে তার স্ত্রী অধ্যাপক কামরুজ্জামান শিরিনকে বিকল্প প্রার্থী দেওয়া হয়েছে। ওই আসনে দলের কেন্দ্রীয় সহদপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপুকে মনোনয়নের চিঠি দেওয়া হয়েছে।

স্ত্রীকে বিকল্প প্রার্থী রেখেছেন যারা : বেশ কয়েকজন নেতা বিকল্প প্রার্থী হিসেবে তাদের স্ত্রীকে রেখেছেন। তারা হলেন- পটুয়াখালী-১ আসনে আলতাফ হোসেন চৌধুরীর স্ত্রী সুরাইয়া আখতার চৌধুরী, সিরাজগঞ্জ-১ আসনে দলের ভাইস চেয়ারম্যান ইকবাল হাসান টুকুর স্ত্রী রোমানা মাহমুদ, পটুয়াখালী-২ শহীদুল আলম তালুকদারের স্ত্রী সালমা আলম, নাটোর-২ আসনে রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর স্ত্রী ইয়াসমিন ছবি, বগুড়া-৩ আসনে আবদুল মুহিত তালুকদারের স্ত্রী মাসুদা মোমেন, কুড়িগ্রাম-১ আসনে সাইফুর রহমান রানার স্ত্রী শামীমা রহমান আপন।

রাজশাহী ও রংপুরে নতুন মুখ : নাটোর-১ আসনে তাইফুল ইসলাম টিপু ও অধ্যক্ষ কামরুন নাহার শিরিন, নাটোর-৩ (সিংড়া), দাউদ আর মাহমুদ ও অধ্যক্ষ আনোয়ার হোসেন আনু, নাটোর-৪ (গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রাম) আবদুল আজিজ, বগুড়া-১ কাজী রফিকুল ইসলাম, নওগাঁ-১ মোস্তাফিজুর রহমান ও মাসুদ রানা, নওগাঁ-২ খাজা নাজিবুল্লাহ চৌধুরী, নওগাঁ-৩ পারভেজ আরেফিন সিদ্দিকী জনি ও রবিউল আলম বুলেট, নওগাঁ-৪ ডা. একরামুল বারী টিপু, নওগাঁ-৫ নাজমুল হক সনি ও জাহেদুল ইসলাম ধলু, নওগাঁ-৬ শেখ রেজাউল ইসলাম রেজু, জয়পুরহাট-১ ফয়সল আলীম ও ফজলুর রহমান, জয়পুরহাট-২ আবু ইউসুফ মোহাম্মদ খলিলুর রহমান, সিরাজগঞ্জ-১ নাজমুল হাসান তালুকদার রানা, সিরাজগঞ্জ-৩ সাইফুল ইসলাম শিশির, সিরাজগঞ্জ-৫ মেজর (অব.) আব্দুল আল মামুন ও আমিরুল ইসলাম আলিম, সিরাজগঞ্জ-৬ ড. এ এ মুহিত।

পঞ্চগড়-১ ব্যারিস্টার নওশাদ জমির, পঞ্চগড়-২ ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধান (জাগপা), দিনাজপুর-১ মঞ্জুরুল ইসলাম ও মামুনুর রশিদ চৌধুরী, দিনাজপুর-২ সাদেক রিয়াজ ও বজলুর রশিদ, দিনাজপুর-৩ সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম, মোফাজ্জল হোসেন দুলাল, দিনাজপুর-৪ হাফিজুর রহমান, দিনাজপুর-৫ জাকারিয়া বাচ্চু, দিনাজপুর-৬ লুৎফুর রহমান মিন্টু ও শাহীন মন্ডল, কুড়িগ্রাম-১ সাইফুর রহমান রানার স্ত্রী শামীমা রহমান আপন, কুড়িগ্রাম-২ আবু বক্কর সিদ্দিক ও সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ, কুড়িগ্রাম-৩ তাসভীর-উল-ইসলাম ও আব্দুল খালেক, কুড়িগ্রাম-৪ মোখলেছুর রহমান ও আজিজার রহমান, লালমনিরহাট-১ ব্যারিস্টার হাসান রাজীব প্রধান।

রংপুর-১ মোকাররম হোসেন সুজন, রংপুর-২ ওয়াহেদুজ্জামান মামুন ও মোহাম্মদ আলী সরকার, রংপুর-৩ রিটা রহমান ও মুক্তিযোদ্ধা মোজাফফর হোসেন, রংপুর-৪ এমদাদুল হক ভরসা, রংপুর-৫ সোলাইমান আলম ফকির ও ডা. মমতাজ, রংপুর-৬ সাইফুল ইসলাম। নীলফামারী-১ ও নীলফামারী-২ মনিরুজ্জামান মন্টু ও শামসুজ্জামান জামান, নীলফামারী-৩ সৈয়দ আলী, সিরাজগঞ্জ-১ আসনে শিল্পী কনকচাঁপা, নীলফামারী-৪ বেবী নাজনীন।

বরিশালে নতুন মুখ : বরিশালে নবম সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপ্রাপ্তদের কেউ বাদ যাননি। বিকল্প প্রার্থীদের সবাই নতুন। তারা হলেন- পটুয়াখালী-১ সুরাইয়া আখতার চৌধুরী, পটুয়াখালী-২ সালমা আলম, পটুয়াখালী-৩ হাসান মামুন, পটুয়াখালী-৪ মনিরুজ্জামান মুনির, বরগুনা-১ নজরুল ইসলাম মোল্লা, ভোলা-২ রফিকুল ইসলাম মনি, ভোলা-৩ কামাল হোসেন, ভোলা-৪ মো. নুরুল ইসলাম নয়ন, বরিশাল-৩ জয়নুল আবেদীন, বরিশাল-৪ রাজীব আহসান, বরিশাল-৫ এবায়দুল হক চাঁন, ঝালকাঠি-২ রফিকুল ইসলাম জামাল ও জেবা খান, পিরোজপুর-৩ রুহুল আমিন দুলাল।

SHARE