রাবিতে শিক্ষক দিবস পালিত

46

স্টাফ রির্পোটার : ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানকালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েন (রাবি) তৎকালীন প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহা পাকিস্তানি সৈন্যের গুলিতে নিহত হন। তাঁর এই আত্মত্যাগকে স্মরণ করে রাবিতে পালিত হলো মহান শিক্ষক দিবস। বৃহস্পতিবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) ভোরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্রশাসন ভবনসহ অন্যান্য ভবনে কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়।
এদিন বাদ জোহর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে কোরআন খানি ও বিশেষ মোনাজাত, বিকেল ৪টা ৩০ ও সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে শহিদ শামসুজ্জোহা হলে দোয়া মাহফিল ও প্রদীপ প্রজ্জ্বলন, সন্ধ্যা ৭টায় রাবি শিক্ষক সমিতির শহিদ ড. জোহা স্মরণে অনলাইন আলোচনা সভা। এ দিন শহিদ স্মৃতি সংগ্রহশালা সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা ছিল।
এর আগে সকাল ১০টায় শহিদ তাজউদ্দিন আহমদ সিনেট ভবনে ড. জোহা স্মরণে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রধান আলোচক ছিলেন অধ্যাপক সনৎ কুমার সাহা।
অধ্যাপক সনৎ কুমার সাহা বলেন, ‘ড. জোহা মানুষ হিসেবে অনন্য ছিলেন। শিক্ষক হিসেবে ছাত্রদের সমস্ত উদ্ভাবনী ও সৃষ্টিশীল কর্মকা-ে তিনি নিজেকে জড়িত রেখেছিলেন। ফুটবল, ক্রিকেটসহ সকল খেলাধুলায় তিনি ছাত্রদের সাথে যোগ দিতেন। শিক্ষক হিসেবে যে দায়িত্ব তা পালন করার জন্যই তিনি প্রতিবাদী ছাত্রদের মিছিলের সামনে নিজে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। ছাত্রদের সামনে থেকে তাদের সুরক্ষার দায়িত্বটাই তিনি সুনিপুণভাবে পালন করেছিলেন। তাঁর এ আত্মত্যাগ অবিস্মরণীয় হয়ে আছে।’
তিনি আরো বলেন, ড. জোহার আত্মদান বাঙালি জাতিকে পাকিস্তানের নিষ্পেশন থেকে মুক্তি পেতে, স্বাধিকার অর্জনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ করে। তাই আমরা দেখতে পাই জোহার আত্মদানের মধ্য দিয়ে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন যে নতুন পর্বে প্রবেশ করে তার পথ ধরেই মুক্তিযুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে স্বাধীনতা লাভ করে।
স্বাধীনতার ৫০ বছরেও আমরা ড. শামসুজ্জোহার জাতীয় স্বীকৃতি পাইনি: সনৎ কুমার সাহা
‘স্বাধীনতার ৫০ বছরেও আমরা ড. শামসুজ্জোহার জাতীয় স্বীকৃতি পাইনি’। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) শহীদ ড. শামসুজ্জোহা স্মরণে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় এ কথা বলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক সনৎ কুমার সাহা। বৃহস্পতিবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের তাজউদ্দীন আহমেদ সিনেট ভবনে ড. শামসুজ্জোহার ৫২ তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে এ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সনৎ কুমার সাহা আরো বলেন, আমরা এই দিনটিকে জাতীয়ভাবে জানাতে ব্যর্থ হয়েছি। কিন্তু ঐদিন তিনি জীবন না দিলে হয়তো সেদিনের গণ আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিত না। সেদিন তিনি নিজের জীবন দেয়ার জন্য সেখানে দাঁড়াননি। তিনি পাকিস্তানী বাহিনির হাত থেকে নিজের ছাত্রদের রক্ষা করার জন্য সেখানে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু তিনি জানতেন না সেই দিনটির জন্য তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। নিজের ছাত্রদের জন্য মূল্যবান জীবন উৎসর্গ করে সেখানে এক অনির্বাণ শিখা স্থাপন করেছেন।
তিনি বলেন, ড. জোহা শিক্ষক হিসেবে কতটা শিক্ষার্থী বান্ধব ছিলেন তার কর্মকান্ড দেখেই বোঝা যায়। তিনি শিক্ষার্থীদের নিয়ে সবার আগে খেলার মাঠে উপস্থিত হতেন। ক্রিকেটটা তিনি একটু বেশি পছন্দ করতেন। ব্যাট, প্যাড নিয়ে সবার আগে খেলার মাঠে উপস্থিত হতেন।
তিনি আরও বলেন, ড. জোহার পরিবার ছিল একটা উদ্বাস্তু পরিবার। পাকিস্তানে তাদের পরিবারটি অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত ছিল। ৬ ভাই বোনের মধ্যে তার ২ বোন ছিল দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। এরকম প্রতিকূল এক পরিবার থেকে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের দায়িত্ব পালন করেন এবং নিজের পরিবারের কথা চিন্তা না করে ছাত্রদের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় তার পরিবারের সাথে এখন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন সম্পর্ক নেই।
উপাচার্য অধ্যাপক এম আব্দুস সোবহানের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় অন্যান্যের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আনন্দ কুমার সাহা ও চৌধুরী মো. জাকারিয়া, রেজিস্ট্রার অধ্যাপক আব্দুস সালামসহ বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
শহিদ ড. জোহা-শহীদ নুরুল ইসলাম স্মরণ সভায় ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় শিক্ষক-ছাত্র দিবস স্বীকৃতির জোর দাবি
১৮ ফেব্রুয়ারিকে জাতীয় শিক্ষক-ছাত্র দিবস হিসেবে স্বীকৃতির জোর দাবি উঠেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল ৪ টায় রাজশাহী নগরীর সাহেব বাজার জিরো পয়েন্ট প্রেসক্লাব মিলনায়তনে ১৯৬৯ সালের গন-অভ্যুত্থানে দেশের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের প্রক্টর ও রসায়ন বিভাগের তৎকালীন শিক্ষক সৈয়দ মোহাম্মদ শামসুজ্জোহা (ড. জোহা) এবং তাঁর শাহাদাতের ঘটনায় প্রতিবাদ করে রাজশাহীর রাজপথে প্রাণ দেয়া রাজশাহী সিটি কলেজের তৎকালীন ছাত্র নুরুল ইসলামের স্বরণে আয়োজিত এক মানববন্ধনে বক্তারা এ দাবি জানান।
রাজশাহী প্রেসক্লাব ও স্মৃতি পরিষদের সভাপতি সাইদুর রহমানের সভাপতিত্ব ও সাধারণ সম্পাদক আসলাম-উদ-দৌলার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এ মানববন্ধনে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন রাজশাহী প্রেসক্লাবের আজীবন সদস্য ও স্মৃতি পরিষদের উপদেষ্টা বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রশান্ত কুমার সাহা। অন্যান্যের মাঝে বক্তব্য রাখেন রাজশাহী প্রেসক্লাবের আজীবন সদস্য গোলাম সারওয়ার, শহীদ লেফটেনেন্ট সেলিম মঞ্চ রাজশাহীর সভাপতি প্রকৌশলী শামসুল আলম, স্মৃতি পরিষদের সহঃ সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার ইকবাল বাদল, সালাউদ্দীন মিন্টু, সদস্য শরিফ উদ্দীন প্রমূখ।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, দেশের জন্য শহীদ ড. শামসুজ্জোহা ও শহীদ নুরুল ইসলামের আত্মদান চিরস্মরণীয়। দিনটিকে জাতীয় শিক্ষক-ছাত্র দিবস হিসেবে স্বীকৃতি সময়ের দাবি। এসব বিশিষ্টজনদের রাষ্ট্রীয়ভাবে স্মরণ না করলে একসময় তরুণ প্রজন্ম দেশের ইতিহাসই ভুলে যাবে। ১৮ ফেব্রুয়ারিকে অবিলম্বে জাতীয় শিক্ষক-ছাত্র দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
এ দিনের কর্মসূচিতে মুক্তিযুদ্ধের তথ্য সংগ্রাহক ওয়ালিউর রহমান বাবু, স্মৃতি পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুল হক দুখু, প্রচার সম্পাদক আমানুল্লাহ আমান, ২৫ নম্বর ওয়ার্ড আহবায়ক ইউসুফ আলী, সদস্য রাকিবুল হাসান শুভ, সাগর নোমানী, নাইম হোসেন, আরিফুল ইসলাম, রাহুল আহম্মেদ, ত্রিশুল কুমার, তৌহিদুল হক, কাটাখালি শাখার আহবায়ক খোকনুজ্জামান মাসুদসহ আরো অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক দিবস পালিত
১৮ ফেব্রুয়ারি মহান শিক্ষক দিবস বা জোহা দিবস উপলক্ষে রাজশাহী বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৮ টায় বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজলা ভবন থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজলা ফটক দিয়ে প্রবেশ করে ড. জোহার মাজারে পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আত্মার মাগফিরাত কামনার মাধ্যমে শেষ হয়। এসময় পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসী বিভাগের কো-অর্ডিনেটর প্রফেসর ড. তারান্নুম নাজ, জাতীয় দিবস উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক ও ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আকরাম হোসেনসহ বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক ও কর্মকর্তাবৃন্দ।
উল্লেখ্য, ১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহারের দাবি এবং সার্জেন্ট জহুরুল হক হত্যার প্রতিবাদে ১৪৪ ধারা ভেঙে সকালে রাস্তায় নামে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে পাকিস্তানি সেনারা মিছিলে গুলি করতে উদ্ধত হয়। খবর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। ছাত্রদের সামনে দাঁড়ান। ‘ডোন্ট ফায়ার, আই সেইড ডোন্ট ফায়ার! কোনো ছাত্রের গায়ে গুলি লাগার আগে যেন আমার বুকে গুলি লাগে।’ ছাত্রদের বাঁচাতে বর্বর পাকিস্তানি সেনাদের বন্দুকের সামনে দাঁড়িয়ে বলিষ্ঠ কণ্ঠে এভাবে চিৎকার করেছিলেন ড. শামসুজ্জোহা। এক পর্যায়ে ড. জোহা ছাত্রদের ক্যাম্পাসে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার আশ্বাস দেন। কিন্তু তাতে কর্ণপাত না করে বেলা ১১টার দিকে ক্যাপ্টেন হাদী পিস্তল বের করে ড. জোহাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন। রাজশাহী নাটোর রোডে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল গেটের দক্ষিণ প¦ার্শে গুলিবিদ্ধ ড. জোহাকে বেয়োনেট চার্জ করা হয় এবং মিউনিসিপল অফিসে ফেলে রাখা হয়। পরে তিনি রাজশাহী হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ভীত রচিত হয়েছিল শহিদ ড. জোহার আত্মত্যাগের মধ্যে দিয়ে। মুক্তিযুদ্ধে প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় তাঁকে।

SHARE