খালেদার মুক্তি ছাড়া নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না : মির্জা ফখরুল

163

স্টাফ রিপোর্টার : বিএনপি মহাসচিব ও জাতীয় ঐক্যফ্রণ্টের মুখপাত্র মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া কোনো নির্বাচন বা নির্বাচনের তফসিল গ্রহণযোগ্য হবে না। তিনি বলেন, নির্বাচনের মাঠ সমান করতে হবে, সব দলকে সমান অধিকার দিতে হবে। দেশনেত্রী বেগম খালদা জিয়াকে মুক্তি দিতে দিতে হবে। অন্যথায় কোনো নির্বাচন বা নির্বাচনের তফসিল গ্রহণযোগ্য হবে না। গতকাল শুক্রবার বিকেলে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা ময়দানে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বিভাগীয় জনসভায় প্রধান বক্তার বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকে এই স্বৈরাচার সরকার আটকে রেখেছে। তিনি অসুস্থ, হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলছিল, সেখান থেকে তাকে জেলখানায় নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, জনগণের মধ্যে ঐক্য গড়ে আমরা বাংলাদেশের মুক্তি জন্য লড়াই করছি। এ জন্যই আমরা সংলাপে বসেছিলাম। আমাদের দাবি ছিল পার্লামেন্ট ভেঙে দিতে হবে, দেশনেত্রীকে মুক্তি দিতে হবে। কিন্তু তা করা হয়নি। গত পাঁচ বছর ধরে গণতন্ত্র রক্ষার জন্য আমরা আন্দোলন করে যাচ্ছি। তারা পুলিশ দিয়ে, বন্দুক-পিস্তল দিয়ে মানুষকে গণতন্ত্রের অধিকার থেকে বঞ্চিত রেখেছে।
মির্জা ফখরুল বলেন, জনগণের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে হটাতে হবে। দেশের সংবিধান ও সার্বভৌমত্ব এবং জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিতে আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। এ সময় বিভিন্ন বাধা অতিক্রম করে গণতন্ত্র ও খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য ছুটে আসা উপস্থিত নেতাকর্মীদের ধন্যবাদ জানান তিনি। বিএনপির মহাসচিব অভিযোগ করে বলেন, সরকার মিথ্যা মামলা দিয়ে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে চায়। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে যে ধরনের বিচার হয়নি খালেদা জিয়াকে তেমন বিচারের মধ্য দিয়ে যতে হচ্ছে। জেলখানায় আটকে ছোট্ট ঘরে তার বিচার করা হচ্ছে। মির্জা ফখরুল উপস্থিত নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, আমরা জানি আপনারা অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন, মামলা-মোকদ্দমা দিয়ে আপনাদেরকে হয়রানি করা হচ্ছে। তাই আপনাদেরকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
শারীরিক অসুস্থতার জন্য জনসভায় উপস্থিত হতে পারেননি ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। জনসভায় তাঁর প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখার কথা ছিল। তবে তিনি জনসভায় উপস্থিত থাকতে না পারলেও মোবাইল ফোনে জনসভায় তার সংক্ষিপ্ত বক্তব্য শোনানো হয়।
ঐক্যফ্রন্টের জনসভায় কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেন, আমি বিএনপির সভায় আসিনি। ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ঐক্যফ্রন্টের জনসভায় এসেছি। তাই আমি যদি সুযোগ পাই, তাহলে বঙ্গবন্ধু ও জিয়ার বিভেদ ঘুঁচাবো। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতি মানেই খালেদা জিয়া। তাই তাকে বন্দি করে রাখা যাবে না। এসময় তিনি বলেন, যতদিন বেঁচে থাকবো বঙ্গবন্ধুকে হৃদয়ে ধরে বেঁচে থাকবো। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আর জিয়াউর রহমানের এই যে দ্বন্দ্ব, এই দ্বন্দ্ব করে যারা দেশকে লুটে পুটে খাচ্ছে। আল্লাহ যদি আমাকে সুযোগ দেন তাহলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও জিয়াউর রহমানের দ্বন্দ্ব আমি মিটিয়ে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ।
ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম নেতা ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেন, সংলাপে গিয়েছিলাম, দেশ-জাতিকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম। বলছি সংঘর্ষে যাবেন না। আমরা নির্বাচনে আসতে চাই, নির্বাচনে আসতে চাই। খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেন, নেতাকর্মীদের মুক্তি দেন। তিনি বলেন, সংলাপে দাবি করেছিলাম, সংসদ বাতিল করেন, আপনি পদত্যাগ করেন। শুনলেন না। তড়িঘড়ি করে তফসিল ঘোষণা করে দিলেন। আমরা যাতে নির্বাচনে যেতে না পারি। দেশের ৯০ শতাংশ ভোটারকে বাদ দিয়ে সাত দফা না মেনে দেশে নির্বাচন হতে পারে না। রব বলেন, হিন্দু, বৌদ্ধ খ্রীষ্টান মেরেছেন। আল্লাহর নবীর খুতবার পরিবর্তে মসজিদে সরকারের গুনগান পড়িয়েছেন। এবার আর রক্ষা নেই। জনতা জেগেছে, দেখে যান। পুলিশ দিয়ে বাধা দিয়েছেন। এবার ভোটের দিন লড়াই। এ লড়াইয়ে জিততে হবে। তফসিল যদি না পেছান, তবে জান দেব তো দাবি ছাড়বো না।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ বলেন, আগামী নির্বাচনে জনজোয়ারে আওয়ামী লীগের নৌকা ভেসে যাবে, তিনি বলেন, আমরা সন্ত্রাস ও সংঘাত এড়ানোর জন্য সমঝোতার পথ বেছে নিয়েছিলাম। গত দশ বছর ধরে দেশে দেশে গণতন্ত্রের সংকট, বিচার বিভাগের সংকট ও আইনের শাসনের সংকট চলছে। মৌলিক অধিকার হারিয়েছে দেশের জনগণ। আমরা এগুলো ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। এনিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে দুই দফা সংলাপে বসেছিলাম। আমরা সাত দফা দাবি উত্থাপন করেছিলাম। কিস্তু সেই সংলাপ সফল হয়নি। কারণ সৈরাচারী সরকার ক্ষমতা ছাড়তে চায়না। ৫ জানুয়ারীর মত আরেকটি নির্বাচন হতে দেয়া হবেনা বলেও জানান তিনি। মওদুদ অভিযোগ করেন, নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতি। তারা চোখেও দেখেনা, কানেও শোনেনা। আমরা এতোদিন জানতান, তফসিল ঘোষণার পর সকল রাজনৈতিক দল সমান অধিকার নিয়ে কাজ করবেন। লেবেল প্লেইং ফিল্ড থাকবে। কিন্তু সরকারের তল্পিবাহক নির্বাচন কমিশন সেটি করতে ব্যর্থ হচ্ছে।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, নির্বাচন কমিশনকে বলছি, নির্বাচন পিছিয়ে দিন। এমন ফাঁদ পেতেছেন যেন আমরা নির্বাচন করতে না পারি। কিন্তু আমরা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সব ফাঁদ ছিন্নভিন্ন করে ফেলবো। একতরফা নির্বাচন কোনোভাবে হতে দেবো না। এ সময় তিনি বলেন, নির্বাচন ২৩ জানুয়ারি হলে অসুবিধা হতো না। আমরা নির্বাচনে যেতে চাই, কিন্তু শেখ হাসিনা সরকার যা শুরু করেছে তাতে নির্বাচন করা সম্ভব না। বিমানবন্দর থেকে এখানে আসতে আমার গাড়ি দু’বার আটকে দিয়েছে, আমি অপিরিচিত কেউ না। আমার গাড়ি কেন আটকাবে। তিনি আরো বলেন, সামরিক বাহিনীকে এতো ভয় পান কেন। এতো কিছু হয়েছে তারা তো ক্ষমতা নেয়নি। আমরা সামরিক বাহিনী চাই না, কিন্তু শেখ হাসিনাকেও চাই না।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও ঐক্যফ্রন্টের রাজশাহী সমন্বয়ক মিজানুর রহমান মিনুর সভাপতিত্বে জনসভায় বক্তব্য রাখেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির চেয়ারম্যান কর্নেল অলি আহমেদ, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু, মোহাম্মদ শাহজাহান, খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা হাবিবুর রহমান হাবিব, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান, বিএনপির প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরীর এ্যানি প্রমুখ। সাত দফা দাবি নিয়ে সিলেট, চট্টগ্রাম ও ঢাকার পর এবার রাজশাহীতে জনসভা করেছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। শুক্রবার বেলা ২টায় রাজশাহীর মাদ্রাসা মাঠে এ সভার কার্যর্ক্রম শুরু হয়। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান মিনু এতে সভাপতিত্ব করেন। জনসভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ^র চন্দ্র রায়, গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসীন মণ্টু, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হারুন অর রশিদ, সাংগঠনিক সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, মহানগর বিএনপির সভাপতি ও সাবেক মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য আবু বকর প্রমুখ।

SHARE