ভোগ নয়, ত্যাগের রাজনীতি করতে হবে : শেখ হাসিনা

98

গণধ্বনি ডেস্ক : আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের পথ ধরে দেশের মানুষকে অর্থনৈতিক মুক্তি এনে দিতে তাঁর দৃঢ় সংকল্পের কথা তুলে ধরে বলেছেন, ‘ভোগ নয়, ত্যাগের রাজনীতি করতে হবে। আওয়ামী লীগ এই নীতিতে বিশ্বাসী বলেই মাত্র এক দশকের মধ্যেই ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে এবং এগিয়ে যাবে। বাংলার মানুষের ভাগ্য নিয়ে আর কেউ ছিনিমিনি খেলতে পারবে না।’

গতকাল শনিবার ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দু’দিনব্যাপী উপমহাদেশের প্রাচীনতম ও ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ২১তম ত্রি-বার্ষিক জাতীয় সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তব্যে দলটির ৩৮ বছর ধরে সভানেত্রীর দায়িত্ব পালনকারী শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। সম্মেলনে সারাদেশ থেকে সাড়ে সাত হাজার কাউন্সিলর এবং ১৫ হাজার ডেলিগেটসহ ৫০ হাজার নেতা-কর্মী ও আমন্ত্রিত অতিথি অংশ নেন। জাতীয় সঙ্গীতের সঙ্গে জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং শান্তির প্রতীক পায়রা ও বেলুন উড়িয়ে সম্মেলনের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর আমন্ত্রিত অতিথি ও কাউন্সিলর-ডেলিগেটরদের সামনে সাংস্কৃতিক উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানে নিয়ে আসা হয় বিশেষ দ্যোতনা। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পর সব ধর্মগ্রন্থ পাঠের মাধ্যমে শুরু হয়ে জাতীয় সম্মেলনের আনুষ্ঠানিকতা। এবারের সম্মেলনের মূল স্লোগান: ‘ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণে গড়তে সোনার দেশ/এগিয়ে চলেছি দুর্বার, আমরাই তো বাংলাদেশ।’ সম্মেলনস্থলে ২৮টি এলইডি পর্দায় দেখানো হয় সম্মেলনের পুরো অনুষ্ঠান।

অনুষ্ঠানিকতার শুরুতেই শোক প্রস্তাব উত্থাপন করেন আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ। শোক প্রস্তাবের পর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা যুদ্ধ, ১৫ আগস্টের সকল শহিদ এবং পরবর্তী সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শহিদদের স্মরণে এক মিনিট দাঁড়িয়ে নিরাবতা পালন করা হয়। এরপর অভ্যর্থনা উপ-কমিটির আহ্বায়ক ও ১৪ দলের সমন্বয়ক মোহাম্মদ নাসিম সবাইকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ একটি অনভূতির প্রতীক। এই দলের নেতৃত্বেই স্বাধীনতাসহ দেশের সব অর্জন এসেছে।’ এরপর সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্ট উপস্থাপন করেন দলটির সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। পরে সভাপতির ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, শত ষড়যন্ত্র ও বারবার আঘাত আসা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ এখন এদেশের সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী রাজনৈতিক দল। ভাষার অধিকার, স্বাধীনতাসহ দেশের যত অর্জন এবং দেশের মানুষ যা কিছু পেয়েছে তা আওয়ামী লীগের কাছ থেকেই। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেই দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়, আওয়ামী লীগই এদেশের মানুষকে কিছু দিতে পেরেছে। দেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি এনে দিতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। জাতির পিতা যে আদর্শে আওয়ামী লীগ গড়ে তুলেছেন, সেই আদর্শ ধারণ করে দেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তিসহ ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা আমরা গড়ে তুলবোই।

আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করতে গত ৭০ বছরে নানা প্রচেষ্টা ও ষড়যন্ত্রের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগের ওপর আঘাত এসেছে বারবার। জাতির পিতাকেও কতবার হয়রানি করা হয়েছে, মিথ্যা মামলা হয়েছে, ফাঁসির আদেশ হয়েছে। তারপরও তিনি সততার সঙ্গে এগিয়ে গিয়েছিলেন বলেই বাঙালি একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছে। ইয়াহিয়া, আইয়ুব খান, জিয়া, এরশাদ, খালেদা জিয়া, যে যখন ক্ষমতায় এসেছে আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন ও ধ্বংস করতে বারবার আঘাত হেনেছে, নানা ষড়যন্ত্র করেছে। এতে আওয়ামী লীগের সাময়িক কিছু ক্ষতি করতে পারলেও জাতির পিতার হাতে গড়া এই সংগঠনকে কেউ ধ্বংস বা নিশ্চিহ্ন করতে পারেনি।

দলের নেতাকর্মীদের বঙ্গবন্ধুর নীতি-আদর্শ মেনে দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করতে আত্মনিয়োগের নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু সততার সঙ্গে এগিয়ে গিয়েছিলেন বলেই বাঙালি একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছে। তাই যিনি ত্যাগ স্বীকার করতে পারেন, তিনিই সফল হবেন। আর এই কাজটা আওয়ামী লীগই সবচেয়ে বেশি করেছে। এর জন্যই জনগণ কিছু পেয়েছে। একটানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার কারণেই দেশ সবদিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০০৯ থেকে ২০১৯ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। এই এক দশকেই বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়েছে, দারিদ্র্যের হার ২০ দশমিক ৫ ভাগে নামিয়ে এনেছি। জাতির পিতা যে স্বল্পোন্নত দেশ রেখে গিয়েছিলেন, আজ আমরা উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হয়েছি। এটা ধরে রাখতে হবে। আমাদের লক্ষ্য সামনে আরও এগিয়ে যাওয়া।

বিএনপি-জামায়াত জোটের ক্ষমতার পাঁচ বছরের দুঃশাসন এবং বিরোধী দলে থাকতে ভয়াল অগ্নিসন্ত্রাস-নাশকতার সমালোচনা করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারীর হাতে ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট বিলিয়ে জন্ম বিএনপির। এই বিএনপি ক্ষমতায় থাকলেও সন্ত্রাস করে, বিরোধী দলে থাকতেও সন্ত্রাস করে। বিএনপি দেশের জন্য কোনো কল্যাণ করতে পারে না। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় ছিল। তাদের আমলে এই দেশ পাঁচ পাঁচ বার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, গ্রেনেড-বোমা হামলা, দুই সংসদ সদস্যকে হত্যা, আমাদের হাজার হাজার নেতাকর্মীর ওপর অমানুষিক নির্যাতন কিছুই বাদ রাখেনি তারা। তবে সবচেয়ে জঘন্য ছিল অগ্নিসন্ত্রাস। পাঁচ শতাধিক মানুষকে তারা আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করেছে।

পঁচাত্তরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পরবর্তী প্রেক্ষাপট তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাজনীতি আমার জন্য নতুন কিছু ছিল না। স্কুল থেকে রাজনীতি করতাম। কিন্তু কখনো ভাবিনি এত বড় সংগঠন আওয়ামী লীগের গুরুদায়িত্ব আমাকে নিতে হবে, এত বড় দায়িত্ব আমি নিতে পারবো। আবেগ-আপ্লুত কণ্ঠে শেখ হাসিনা বলেন, পঁচাত্তরে বাবা-মা সবাইকে হারিয়েছি। ছয়টি বছর আমাকে দেশে আসতে দেয়নি অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী জিয়াউর রহমান। রিফিউজি ছিলাম আমরা দুই বোন। ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগ আমার অবর্তমানে আমাকে সভাপতি নির্বাচিত করেছিল। নেতাকর্মীদের আহ্বানে দেশে ফিরে এসেছিলাম। এসময় ওই সময়ের বৈরী অবস্থার কথা তুলে ধরেন বঙ্গবন্ধু কন্যা।

দলীয় নেতা-কর্মীদের রাজনীতির মাহাত্ম্য তুলে ধরতে গিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ থেকে উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, ‘নীতিবিহীন নেতা নিয়ে অগ্রসর হলে সাময়িকভাবে কিছু ফল পাওয়া যায়। কিন্তু সংগ্রামের সময় তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘এটাই হচ্ছে সব থেকে বড় বাস্তবতা। যে কোনো রাজনৈতিক নেতার জীবনে নীতি-আদর্শ সব থেকে বড়, আর সেই আদর্শের জন্য যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে সদা প্রস্তুত থাকতে হবে। যিনি প্রস্তুত থাকতে পারেন, ত্যাগ স্বীকার করতে পারেন, তিনি সফল হতে পারেন। দেশকে কিছু দিতে পারেন।

দলকে তৃণমূল থেকে আরও শক্তিশালী করার উপর জোর দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ইতিমধ্যে আমাদের সারা বাংলাদেশে প্রায় ২৯টি জেলার কাউন্সিল হয়ে গেছে। বাকি জেলার কাউন্সিলগুলোও আমরা করব। সংগঠনকে তৃণমূল থেকে আরও শক্তিশালী করা, এটাই আমাদের লক্ষ্য।

SHARE