সু চির মিথ্যাচার থামেনি

125

গণধ্বনি ডেস্ক : মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) তার বহুল প্রতীক্ষিত বক্তব্যে আবারও ডাহা মিথ্যাচার করেছেন। বিচারক, কূটনীতিক, মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিকদের সামনে তিনি দাবি করেন, রাখাইনে গণহত্যার ঘটনা ঘটেনি। সেখানে কয়েকশ’ মৃত্যু ঘটে থাকতে পারে। নেদারল্যান্ডসের হেগে জাতিসংঘের এই শীর্ষ আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে গণহত্যা, ধর্ষণ ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। গতকাল বুধবার মিয়ানমারের পক্ষে শুনানিতে দাঁড়িয়ে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর সু চি বলেন, রাখাইনে সেনা অভিযানে অতিরিক্ত বল প্রয়োগের অভিযোগ হয়তো উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে তার পেছনে ‘শুধুই গণহত্যার অভিপ্রায় থাকার অনুমান ঠিক নয়।’ তবে জাতিসংঘের তথ্যানুসন্ধান মিশন সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে বলেছে, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নিপীড়নের যে অভিযোগ পাওয়া গেছে তাতে গণহত্যার তদন্ত হওয়া উচিত। গত আগস্টে জাতিসংঘের তথ্যানুসন্ধান মিশন এক প্রতিবেদনে বলেছে, মিয়ানমারের সেনারা নারী, পুরুষ, ছেলেমেয়ে ও হিজড়াদের ওপর নিয়মিত এবং পদ্ধতিগত ধর্ষণ, গণধর্ষণ ও অন্যান্য সহিংস ও জবরদস্তিমূলক যৌন কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। মঙ্গলবার দ্য হেগের পিস প্যালেসে গাম্বিয়ার পক্ষে বক্তব্যে দেশটির আইনমন্ত্রী আবুবকর তাম্বাদু মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর বর্বরতার চিত্র তুলে ধরেন এবং গণহত্যা বন্ধের দাবি জানান। গতকাল তারই জবাব দেন সু চি ও তাদের দেশের পক্ষে নিয়োজিত তিন আইনজীবী। আইনজীবীরা মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আইসিজের সম্ভাব্য অন্তর্র্বতী আদেশের ঘোর বিরোধিতা করেন। খবর এএফপি, বিবিসি, রয়টার্স ও নিউইয়র্ক টাইমসের। আদালতে সু চি দাবি করেন, রাখাইনের পরিস্থিতি সম্পর্কে গাম্বিয়া যে চিত্র উপস্থাপন করেছে তা ‘অসম্পূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর’। তবে তিনি বলেননি যে রোহিঙ্গা নিধনের কেন্দ্র রাখাইনে কূটনীতিক, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি, মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে তার সরকার। এমনকি জাতিসংঘ কর্মকর্তা ও তদন্তকারীরাও সেখানে যেতে পারেননি। ফলে সেখানকার ‘সম্পূর্ণ’ চিত্র কীভাবে পাওয়া যাবে তা এড়িয়ে যান সু চি। সু চি তার বক্তব্যের শুরুতে আন্তর্জাতিক আইন ও সনদগুলোর বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে আদালত সহায়তা করবেন বলে আশা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, গণহত্যা সনদের বিধান রুয়ান্ডা ও সাবেক যুগোস্লাভিয়ায় প্রয়োগ করা হয়নি। বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমারে ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে সেনা অভিযানে হাজার হাজার রোহিঙ্গা নিহত হয় এবং প্রায় সাড়ে ৭ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে প্রতিবেশী বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। তাদের বর্ণনায় উঠে আসে নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণ, জ্বালাও-পোড়াওয়ের ভয়াবহ বিবরণ। অভিযানে হাজার হাজার রোহিঙ্গা নিহত হন। একে ‘জাতিগত নির্মূল অভিযানের ধ্রুপদি’ উদাহরণ বলে মন্তব্য করেছে জাতিসংঘ।

আদালতে সু চি বলেন, মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের পরিস্থিতি উপলব্ধি করা সহজ নয়। ২০১৭ সালের আগস্টের ঘটনাবলি শুরু হয়েছিল যখন স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো পুলিশ ফাঁড়ির ওপর আক্রমণ চালায়। তবে তিনি স্বীকার করেন, মিয়ানমারের প্রতিরক্ষা বাহিনী হয়তো মাত্রাতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করে থাকতে পারে। মিয়ানমারের সৈন্যরা যুদ্ধাপরাধ করলে তাদের বিচার করা হবে। তিনি বলেন, স্থানীয় সশস্ত্র গ্রুপ হামলা চালানোর পর মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তাদের বিরুদ্ধে ওই অভিযান চালিয়েছিল, কোনো জাতি বা ধর্মীয় সম্প্রদায় এর লক্ষ্য ছিল না। তবে জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাখাইনে শুধু মুসলিম ধর্মাবলম্বী রোহিঙ্গাদের ওপরই গণহত্যা চালানো হয়েছে এবং তাদের ঘরবাড়ি নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে। হামলায় বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরাও অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। ওই অভিযানের ফলে রাখাইনের বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং তারা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে বলে স্বীকার করেন সু চি। তিনি বলেন, যদি কোনো সেনাসদস্য নিয়ম ভেঙে থাকে, তাহলে সামরিক আদালতে তার বিচার হতে পারে। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয় আন্তর্জাতিক আদালতে এনে সমস্যার সমাধান করা যাবে না। তবে বিশ্নেষকরা বলছেন, মিয়ানমারের সামরিক আদালত বিশ্বের দৃষ্টি অন্যত্র সরানোর জন্য ‘হোয়াইট ওয়াশ’ ছাড়া আর কিছু নয়। রাখাইন বা অন্য কোথাও মানবাধিকার লঙ্ঘনের কোনো ঘটনা মিয়ানমার প্রশ্রয় দেবে না দাবি করে সু চি বলেন, তার সরকার রাখাইনের সব পক্ষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। রাখাইনের বাস্তুচ্যুত বাসিন্দাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের বিষয়েও মিয়ানমার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক কোনো হস্তক্ষেপ হলে তা মিয়ানমারে শান্তি ও বাস্তুচ্যুতদের ফেরার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করবে বলেও সতর্ক করেন রাখাইন গণহত্যায় ‘দোসর’ হিসেবে পরিচিত সু চি। তিনি বলেন, রাখাইনে ক্লিয়ারেন্স অপারেশনকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। ক্লিয়ারেন্স অপারেশন শুধু সন্ত্রাস ও বিচ্ছিন্নতাবাদ মোকাবিলার প্রশ্নে ব্যবহূত হয়েছে। তার দাবি, রাখাইনে কোনো ধরনের বৈষম্য করা হবে না। মুসলমান শিশু ও ছাত্রছাত্রীদের জন্য বৃত্তি চালু করা হচ্ছে। তিনটি আইডিপি (ইন্টারনালি ডিসপেল্গসড পিপল) শিবির বন্ধ করা হয়েছে। দেশান্তরিত লোকজনকে স্বেচ্ছামূলক ও নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তিনি প্রশ্ন করেন, এ রকম অবস্থায় কীভাবে বলা হয় যে গণহত্যার উদ্দেশ্য নিয়ে সেখানে কার্যক্রম চলছে? মিয়ানমারে গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘ সংগ্রামের কারণে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া সু চি এক সময় ছিলেন আন্তর্জাতিকভাবে নন্দিত ব্যক্তিত্ব। রোহিঙ্গা ইস্যুতে তার ভূমিকার কারণে তিনি এখন বিশ্বের নিন্দা ও ধিক্কারের পাত্রী হন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাকে দেওয়া সম্মাননা প্রত্যাহার করে নেয়। গণহত্যার মামলায় আদালতে সু চির উপস্থিতিকে তাই এক নাটকীয় ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছিল। তার আগমন উপলক্ষে হেগে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়। মিয়ানমারে সু চির সমর্থকরা আশা করেছিলেন, যুক্তরাজ্যে ডিগ্রিধারী এবং ইংরেজিতে দক্ষ সু চি আইসিজেতে উপস্থিত হয়ে বিশ্বকে মাত করবেন। হয়েছে তার বিপরীতটা। গণহত্যার পক্ষে আদালতে দাঁড়িয়ে তিনি আরও বেশি নিন্দা কুড়িয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোর ইমাম আবদুল মালিক মুজাহিদও শুনানি দেখতে হেগে উপস্থিত হন। নিউইয়র্ক টাইমসকে তিনি বলেন, আইজিসেতে সু চির উপস্থিতি হিতে বিপরীত হয়েছে। তিনি তার সরকারের ক্ষতি করেছেন। তিনি উপস্থিত না হলে বিশ্ব হয়তো এ মামলায় এত মনোযোগ দিত না। তিনিই মামলাটিকে আলোচনায় এনেছেন। তিন দিনের শুনানির তৃতীয় ও শেষ দিনে আজ বৃহস্পতিবার গাম্বিয়া ও মিয়ানমার প্রতিপক্ষের যুক্তি খণ্ডনের চেষ্টা করবে। এরপর আদালত আদেশের জন্য বিষয়টি অপেক্ষমাণ রাখবেন। ৮ সপ্তাহের মধ্যে আদেশ দিতে পারেন ১৫ সদস্যের এ আদালত। শুনানিতে অংশ নিতে বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের তিন সদস্যের প্রতিনিধি দল হেগে গেছে। অংশ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকারের একটি প্রতিনিধি দলও। ওআইসিভুক্ত পশ্চিম আফ্রিকার ক্ষুদ্র দেশ গাম্বিয়া গত মাসে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যা প্রতিরোধ ও এর শাস্তির বিধানে ১৯৪৮ সালে স্বাক্ষরিত ‘জেনোসাইড কনভেনশন’ লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে এ মামলা করে। গাম্বিয়া নিজেও ওই কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশ এবং ১৯৫৬ সালে মিয়ানমারও স্বাক্ষর করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আইসিজেতে এ নিয়ে তৃতীয় গণহত্যা মামলার শুনানি চলছে। আইসিজে এ মামলা গ্রহণ করলে পূর্ণাঙ্গ রায় হতে কয়েক বছরও লেগে যেতে পারে। তবে আদালত কোনো অন্তর্র্বতী আদেশ দিলে তা মানা মিয়ানমারের জন্য বাধ্যতামূলক। এক্ষেত্রে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি হতে পারে। বিশ্নেষকরা বলছেন, আদালত যদি মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রায় নাও দেন, তবু এ মামলায় দেশটির বিপুল আর্থিক ও রাজনৈতিক ক্ষতি হবে।

SHARE