মন্ত্রীর কাছে শতবর্ষী ১৩ কলেজের ৫৪ দাবি

107

স্টাফ রিপোর্টার : প্রতিষ্ঠার ১০০ বছর অতিক্রম করেছে, দেশে এমন কলেজের সংখ্যা ১৩টি। এই কলেজগুলোর পক্ষ থেকে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির কাছে ৫৪টি দাবি জানানো হয়েছে। ১৩টি কলেজের শিক্ষার উৎকর্ষ সাধনে আয়োজিত এক কর্মশালায় কলেজগুলোর অধ্যক্ষরা এসব দাবি তুলে ধরেন। তারা মনে করেন, তাদের এসব দাবি বাস্তবায়ন হলে শিক্ষার উৎকর্ষ সাধন হবে। শুধু তাই নয়, দেশের অন্যান্য সরকারি কলেজগুলো এসব কলেজকে ‘রোল মডেল’ হিসেবে গণ্য করবে। শিক্ষামন্ত্রী তাদের দাবিগুলো যৌক্তিক অভিহিত করে বলেছেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আগে নিয়ে কাজ শুরু করা হবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিংয়ে দেশসেরা রাজশাহী সরকারি কলেজ মিলনায়তনে রোববার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এই কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্মশালাটির আয়োজন করে। এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব সোহরাব হোসাইন। শতবর্ষী ১৩টি কলেজ হলো- রাজশাহী কলেজ, চট্টগ্রাম কলেজ, চট্টগ্রামের হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ, নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজ, বরিশালের ব্রজমোহন কলেজ, সিলেটের মুরারিচাঁদ কলেজ, পাবনার এডওয়ার্ড কলেজ, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ, খুলনার ব্রজলাল কলেজ, ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজ, রংপুরের কারমাইকেল কলেজ, বাগেরহাটের প্রফুল্লচন্দ্র কলেজ এবং ফরিদপুরের রাজেন্দ্র কলেজ। কর্মশালায় এসব কলেজের অধ্যক্ষরা অংশ নেন। কর্মশালার শুরুতেই শিক্ষামন্ত্রী এই কলেজগুলোর উৎকর্ষতা কীভাবে আরও বৃদ্ধি করা যায় সে বিষয়ে অধ্যক্ষদের মতামত চান। একে একে ১৩টি কলেজের অধ্যক্ষই বক্তব্য দেন। সবাই মিলে তুলে ধরেন ৫৪টি দাবি। এগুলোকে ‘পরামর্শ’ হিসেবে গ্রহণ করে লিখে নেন শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তারা। এর মধ্যে অধ্যক্ষরা দাবি জানিয়েছেন, শতবর্ষী কলেজের শিক্ষকদের বদলি হলে সেটা যেন আরেকটি শতবর্ষী কলেজেই হয়ে থাকে। শতবর্ষী ১৩টি কলেজের ভর্তি পরীক্ষা সমন্বিত করার বিষয়টিও জোর দিয়েছেন তারা। এছাড়া শিক্ষকদের বিভিন্ন ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি, কলেজে বিভাগের সংখ্যা বৃদ্ধি, শিক্ষকদের ছুটি বৃদ্ধি, চিকিৎসক ও তথ্য-প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী নিয়োগ, একটি কলেজের সঙ্গে আরেকটির যোগাযোগ বৃদ্ধি, অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ব্যবস্থা, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, বেতন বৈষম্য দূর, গ্রন্থাগারকে আরও সমৃদ্ধ করা, গবেষণায় বরাদ্দ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষক সংকট দূর করা, খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগসহ মোট ৫৪টি দাবি উঠে আসে অধ্যক্ষদের বক্তব্যে। ব্রজমোহন কলেজের অধ্যক্ষ ড. হুমায়ুন কবীর মজুমদার বলেন, কোনো শিক্ষার্থী রাজশাহী কলেজের মতো দেশসেরা কলেজে ভর্তির সুযোগ না পেলে অন্য কোনো কম মানসম্পন্ন কলেজে ভর্তি হতে বাধ্য হয়। কিন্তু তার যদি সুযোগ থাকতো, তাহলে রাজশাহী কলেজের পরের স্থানেই যে কলেজটি থাকতো, সেটিতে সে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করতো। তাই অন্তত ঐতিহ্যবাহী শতবর্ষী কলেজগুলোকে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষায় আনা উচিত। তাহলে মেধাক্রম অনুযায়ী শিক্ষার্থীরা কলেজগুলোতে ভর্তি হতে পারবে। আনন্দ মোহন কলেজের অধ্যক্ষ নারায়ণ চন্দ্র ভৌমিক বলেন, শিক্ষা ব্যবস্থায় অনেক নতুন নতুন বিষয় যুক্ত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নতুন বিষয় পেয়েছে। কিন্তু কলেজগুলো পায়নি। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠারও আগে এসব কলেজের জন্ম। তাই অন্তত শতবর্ষী কলেজগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সাংবাদিকতা, ফিসারিজ, ফার্মেসী, হোটেল ম্যানেজমেন্ট, আইন এবং তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু করা উচিত। তাহলে অন্য কলেজগুলো এগুলোকে আদর্শ কলেজ হিসেবে মনে করবে। রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর হবিবুর রহমান বলেন, দেশের এই ১৩টি কলেজ অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েরই আগে প্রতিষ্ঠিত। এসব কলেজের যে জায়গা রয়েছে তা অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েরই নেই। তাহলে কেন শিক্ষায় পিছিয়ে থাকবে কলেজগুলো? আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতার পরও দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। সেভাবে ঐতিহ্যবাহী এসব কলেজগুলোকেও এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, দেশের এই ১৩টি কলেজে মনোযোগ দিলে আকর্ষণীয় কিছু করা সম্ভব। তারা সেভাবেই পরিকল্পনা করছেন। এখানে যেসব বিষয় উঠে এসেছে তার সবগুলোই গুরুত্বপূর্ণ। এখন কোনটা আগে করা যায় সেই বিষয়টা ঠিক করতে হবে। তবে নতুন বিষয় চালু এবং সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার বিষয়টি একটু চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। তিনি বলেন, এই কলেজগুলোতে ১০০ বছরের পুরনো বই আছে। এক কলেজের বই যদি অন্য কলেজের শিক্ষার্থীদের পড়ার সুযোগ করে দেয়া যায় তবে সেটাও খুব ভাল হবে। মন্ত্রী বলেন, কলেজের অনেক বিভাগ বেকার তৈরি করছে। প্রয়োজনে সেসব বিভাগ বন্ধ করে দিতে হবে। সেই জায়গায় যুগের সাথে তাল মিলিয়ে বিভাগ চালু করতে হবে। তবে শিক্ষার্থী ভর্তির সময় সতর্ক থাকতে হবে। যে কলেজ যতজন শিক্ষার্থী ভর্তির উপযুক্ত ঠিক ততজনকেই ভর্তি নিতে হবে। কর্মশালায় মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব সোহরাব হোসাইন বলেন, তিনি শিক্ষকদের ৫৪টি দাবি লিখে নিয়েছেন। পরামর্শ হিসেবেই এগুলো গ্রহণ করা হলো। যেভাবে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হচ্ছে তাতে আগামী ৫-৭ বছর পর কেউ ভবন চাইবে না। আমরা সেভাবেই কাজ করছি। আর জনবল সংকট কাটাতে এই মূহুর্তে ১২ হাজার পদ সৃষ্টির কাজ চলছে। সভায় সভাপতিত্ব করেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. হারুন-অর-রশিদ। তিনি বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এটাই প্রথমবারের মতো দেশের শতবর্ষী সবগুলো কলেজকে একসঙ্গে নিয়ে কর্মশালা হলো। এটার গুরুত্ব অনেক। আমরা এই ১৩টি কলেজকে একটা নেটওয়ার্কিংয়ের ভেতর আনতে চাচ্ছি। কর্মশালায় যেসব বিষয় উঠে এলো সেগুলো প্রতিবেদন আকারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া হবে। দ্রুতই এসব বিষয়ে পদক্ষেপ নেবে মন্ত্রণালয়। কর্মশালায় অন্যদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন ও অর্থ) ড. অরুণা বিশ্বাস, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সৈয়দ ড. মো. গোলাম ফারুক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ড. হাফিজ মুহম্মদ হাসান বাবু, প্রফেসর ড. মশিউর রহমান প্রমুখ।

SHARE