শিক্ষকরা পদের লবিং নিয়ে ব্যস্ত : রাষ্ট্রপতি

105

স্টাফ রিপোর্টার , রাবি : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) একাদশ সমাবর্তনে অংশ নিয়ে গ্রাজুয়েটদের উদ্দেশে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেছেন, তোমরা দেশের উচ্চতর মানবসম্পদ। দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নে ও অগ্রগতি নির্ভর করছে তোমাদের ওপর। তোমাদের তারুণ্য, জ্ঞান, মেধা ও প্রজ্ঞা হবে দেশের উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ থেকে একজন গ্রাজুয়েট হিসেবে সবসময়ে সত্য ও ন্যায়কে সমুন্নত রাখবে। নৈতিকতা ও দৃঢ়তা দিয়ে দুর্নীতি ও অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে। রাষ্ট্রের বিবেকবান নাগরিক হিসেবে তোমাদের কাছে জাতির প্রত্যাশা তোমরা কখনো অর্জিত ডিগ্রির মর্যাদা, ব্যক্তিগত সম্মানবোধ আর নৈতিকতাকে ভুলুণ্ঠিত করবে না। বিবেকের কাছে কখনো পরাজিত হবে না। গতকাল শনিবার রাবিতে অনুষ্ঠিত সমাবর্তনে সভাপতির বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি তাঁর লিখিত বক্তব্যে এসব কথা বলেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্যও। বিশ্ববিদ্যালয়ের শেখ কামাল স্টেডিয়ামে বিকাল সাড়ে ৩টার পর অনুষ্ঠান শুরু হয়।

অনুষ্ঠানে সমাবর্তন বক্তা ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. রঞ্জন চক্রবর্তী। বক্তব্যের শুরুতে রাষ্ট্রপতি অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকলকে শুভেচ্ছা জানান। পরে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং মুক্তিযুদ্ধসহ স্বাধিকার ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে আত্মোৎসর্গকারী বীর শহীদদের স্মরণ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নামে ওঠা নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, শিক্ষকরা উন্নত জাতি তৈরির মহান কারিগর। শিক্ষকের কথা কেবল বক্তৃতা নয়- তা বাণী। বাণী শ্রোতার বুদ্ধি ও বিবেককে জাগ্রত করে। বাণী শ্রোতার অন্তরে জ্ঞানের মশাল প্রজ্জ্বলিত করে। আদর্শ, প্রচেষ্টা ও বৃত্তি ছাড়া পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস মূল্যহীন। তাই একজন শিক্ষককে আদর্শ ও ন্যায়-নীতির প্রতীক হতে হবে। কিন্তু সম্প্রতি গণমাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে প্রকাশিত খবর আচার্য হিসেবে আমাকে মর্মাহত করে। আজকাল বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা যাচ্ছে শিক্ষকগণ প্রশাসনের বিভিন্ন পদ-পদবী পাওয়ার লোভে লবিং-এ ব্যস্ত। অনেকে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করতেও পিছপা হন না। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক ভুলে গিয়ে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট লেনদেনে সম্পৃক্ত হন। এটা অত্যন্ত অসম্মানের ও অর্যাদাকর। বিশেষ অতিথির বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, গবেষণা ছাড়া একটি বিশ্ববিদ্যালয় সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ছাড়া আর কিছুই নয়। যা কখনোই আমাদের কাম্য নয়। শিক্ষার উদ্দেশ্য আত্মবিশ্বাসী করে তোলা। যেই শিক্ষা আমাদের আত্মবিশ্বাসী করে না সেই শিক্ষা বৃথা। বর্তমানে শ্রমবাজারের চাহিদানুযায়ী আমরা শিক্ষার্থীদের তৈরি করতে পারছি না। বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের সেসব দক্ষতা তৈরি করতে পারছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষকদের কথা উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, শিক্ষকদের কাছে আমরা সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা আশা করি। কিন্তু শিক্ষকরা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য সংকীর্ণ দলাদলিতে নেমে পড়েন। শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের কাছে আসে শেখার জন্য। শিক্ষকদের মনে রাখতে হবে তারা দেশ ও দশের কাছে দায়বদ্ধ। তাই জাতির আশা পূরণে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদেরকে সেভাবেই তৈরি করবেন। সমাবর্তন বক্তা অধ্যাপক ড. রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, জাতিসংঘ তাদের রিপোর্টে দেখিয়েছে বিশ্বের এক শ ভাগ তরুণের মধ্যে ৪৮ ভাগই এশিয়ার। আজকে তোমরা যারা ডিগ্রি অর্জন করছো তারাও তরুণ। আমরা ভারতীয়, বাংলাদেশি কিংবা চীনা যাই হই না কেন, আমাদের মনে করতে হবে আমরা বিস্তৃত এশিয়া মহাদেশের অধিবাসী। এখন সময় এগিয়ে চলার, ন্যায় ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার। এশিয়া মহাদেশকে সুসংহত করে গড়ে তোলার জন্য তোমাদের মতো তরুণদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। যেই এশিয়া হবে সবদিক দিয়ে সমৃদ্ধ। এর আগে বিকেল ৩টার দিকে হেলিকাপ্টার যোগে রাষ্ট্রপতি বিশ্ববিদ্যালয়ের সৈয়দ আমীর আলী হল সংলগ্ন মাঠে অবতরণ করেন। সেখানে তাঁকে ফুল দিয়ে অভ্যর্থনা ও লালগালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়। এরপর রাষ্ট্রপতি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনে যান। সেখানে তাকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। বিকাল ৩টা ৩৫ মিনিটে রাষ্ট্রপতি সমাবর্তন মঞ্চে আসন গ্রহণ করেন। পৌনে ৪টায় তিনি সমাবর্তনের শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন। এরপর জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন ও পবিত্র ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ শেষে ১০টি অনুষদ ও দুটি ইনস্টিটিউটের প্রায় তিন হাজার ৪৩২জন গ্রাজুয়েটের ডিগ্রি ঘোষণা করেন রাষ্ট্রপতি। অনুষ্ঠানের শেষের দিকে রাষ্ট্রপতিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সমাবর্তন স্মারক প্রদান করা হয়। রাষ্ট্রপতি দীপু মনি ও অধ্যাপক রঞ্জন চক্রবর্তীকে সমাবর্তন স্মারক প্রদান করেন।

সমাবর্তনে স্বাগত বক্তব্য দেন রাবি উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আনন্দ কুমার সাহা। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন কোষাধ্যক্ষ এ কে এম মোস্তাফিজুর রহমান। রাবির ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক মলয় ভৌমিকের সঞ্চালনায় সমাবর্তনে আরো বক্তব্য দেন রাবি উপাচার্য অধ্যাপক এম আব্দুস সোবহান, উপ-উপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী মো. জাকারিয়া প্রমুখ। এসময় আরো উপস্থিত ছিলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এমপি, রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন, ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, অনুষদের ডিন, সিনেট ও সিন্ডিকেটের সদস্য, আমন্ত্রিত অতিথি, শিক্ষকমণ্ডলী, কর্মকর্তা-কর্মচারী, গ্রাজুয়েট, পোস্ট গ্রাজুয়েটবৃন্দ ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। সাড়ে ৫টার দিকে রাষ্ট্রপতি সামবর্তন অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করেন। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করেন খোরশেদ আলম ও লুইপা। এদিকে সমাবর্তন উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করে। সকাল থেকেই সমাবর্তনস্থলে সমবেত হতে শুরু করেন গ্রাজুয়েটরা। কেউ কেউ ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে দল বেঁধে ছবি তোলেন। অনেকে আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন জায়গায় আড্ডায়ও মেতে ওঠেন।

SHARE