আন্দোলনকারীরা অনড় বিক্ষোভে উত্তাল জাবি

81

গণধ্বনি ডেস্ক : দুর্নীতির অভিযোগে উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের অপসারণের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলা ও ভার্সিটি বন্ধের প্রতিবাদে গতকাল বুধবারও উত্তাল ছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি)। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আবাসিক হল ত্যাগের নির্দেশ দিলেও এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে গতকালও দিনভর বিক্ষোভসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। আজ বৃহস্পতিবারও প্রশাসনিক ভবনে তালা ও বিক্ষোভ মিছিলসহ নানা কর্মসূচি পালন করবেন আন্দোলনকারীরা। এদিকে, গতকাল রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ বিভাগের পরিচালক আবদুস সালাম স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়, কর্তৃপক্ষ ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের অবস্থান ও মিছিল-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। ক্যাম্পাসের সব দোকানপাটও বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এরই মধ্যে সাধারণ শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হল ছাড়লেও ক্যাম্পাস ছাড়েননি আন্দোলনকারী শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। আবাসিক হলে থাকতে না দিলেও ক্যাম্পাসে অবস্থান করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তারা। এখন আর উপাচার্যের পদত্যাগ বা অপসারণ নয়, আচার্যের কাছে তার বরখাস্ত দাবি করছেন আন্দোলনকারীরা। ক্যাম্পাসে আন্দোলন ও উত্তেজনার মুখে গতকাল উপাচার্যের বাসভবনে মোতায়েন করা হয়েছে শতাধিক পুলিশ সদস্য।

‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ ব্যানারে গতকাল সকাল ৯টা থেকেই আন্দোলনকারীরা উপাচার্যের অপসারণের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কলা ও মানবিকী অনুষদ ভবন-সংলগ্ন মুরাদ চত্বরে জড়ো হতে থাকেন। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন এবং পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অফিসে কর্মচারীরা প্রবেশ করতে চাইলে তাদের সরিয়ে দেন আন্দোলনকারীরা।

সংহতি সমাবেশ :সকাল সাড়ে ১০টায় দুই শতাধিক শিক্ষক-শিক্ষার্থীর একটি বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে। ছাত্রীদের হল হয়ে পরিবহন চত্বর ঘুরে মিছিলকারীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতন রেজিস্ট্রার ভবনের সামনে অবস্থান নেন। সেখানে উপাচার্যকে বরখাস্তের দাবিতে সংহতি সমাবেশ করেন আন্দোলনকারীরা। সংহতি সমাবেশ চলে বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত।

সমাবেশে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘সমস্যার সমাধান শিক্ষার্থীদের হল ছাড়া করা নয়- উপাচার্যের অপসারণ। ছাত্রীদের বেরিয়ে আসার মধ্য দিয়ে হল বন্ধের নির্দেশ প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। উপাচার্য নৈতিক অবস্থান হারিয়েছেন। আইয়ুব খানের অধ্যাদেশের মতো চারটি বিশ্ববিদ্যালয় চলছে। এগুলোর উপাচার্যরা নিপীড়ক ও দুর্নীতিবাজদের অবস্থানে। শোভন-রাব্বানী তাদের পদ হারিয়েছে। কিন্তু সরকার এসব উপাচার্যের বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত বা বিচারিক ব্যবস্থা নেয়নি।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর তপন কুমার সাহা বলেন, ‘চার বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের দায়িত্ব পালন করেছি। কিন্তু কখনও বিশেষ ছাত্র সংগঠনকে নামানোর প্রয়োজন হয়নি! এখন কেন হলো? মঙ্গলবারের ঘটনায় ব্যথিত হয়েছি। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা লাঞ্ছিত হওয়ার পর উপাচার্য এটিকে গণঅভ্যুত্থান বলেছেন। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শিক্ষক হিসেবে আমার এটি দুর্ভাগ্য। জাহাঙ্গীরনগরকে রক্ষা করার দায়িত্ব সবার। এর আগে এ আন্দোলনের সঙ্গে আসিনি। কারণ, নিজেকে বোঝাতে পারিনি; কিন্তু এখন পেরেছি। অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের বিরুদ্ধে শুধু তদন্ত নয়, বরং তাকে বিচারের মুখোমুখি হতেই হবে।’

আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক দর্শন বিভাগের অধ্যাপক কামরুল আহসান বলেন, ‘উপাচার্যের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত অবশ্যই হবে। এখন অপেক্ষা, তিনি শিক্ষক হিসেবে থাকবেন কিনা। জাহাঙ্গীরনগরে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছে, তা কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে আন্দোলন নয়। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা যখন নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করছিল, তখন তিনি সেখানে ছাত্রলীগকে দিয়ে হামলা করালেন। তারপর আবার ছাত্রলীগকে ধন্যবাদ দিলেন! এ ঘটনার পর অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম তার পদে আর কোনোভাবেই বহাল থাকতে পারেন না।’

এ সময় অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী তাপসী প্রাপ্তি বলেন, ‘হলে তালা মেরে বন্ধ করে রাখা হয়েছিল, যাতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে অংশ নিতে না পারে। আমরা এ আচরণের তীব্র নিন্দা জানাই। অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম কোনোভাবেই ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না।’

সংহতি সমাবেশে আরও বক্তৃতা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক তানজীম উদ্দিন খান, জাবির অধ্যাপক রায়হান রাইন, অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌস, অধ্যাপক মির্জা তাসলিমা সুলতানা, অধ্যাপক আনোয়ারুল্লাহ ভূঁইয়া, অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক, অধ্যাপক খবির উদ্দিন, অধ্যাপক কবিরুল বাশার, অধ্যাপক শরমিন্দ নীলোর্মি। এ ছাড়া ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রফ্রন্ট ও ছাত্র মৈত্রীর কেন্দ্রীয় নেতারাও বক্তব্য দেন।

শেষবার ক্যাম্পাস ত্যাগের নির্দেশ :সমাবেশ চলাকালে দুপুর ২টায় বিশ্ববিদ্যালয় হল প্রভোস্ট কমিটির এক জরুরি বৈঠক থেকে গতকাল শেষবারের মতো (বিকেল সাড়ে ৩টার মধ্যে) হলত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রভোস্ট কমিটির সভাপতি অধ্যাপক বশির আহমেদ বলেন, ‘এ সময়ের হল ত্যাগ না করলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে।’

হল ছেড়েছে সাধারণ শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগ :মঙ্গলবারের নির্দেশ না মানলেও গতকাল হল ছেড়েছে সাধারণ শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল রানা বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সিদ্ধান্তকে শ্রদ্ধার সঙ্গে মেনে নিয়ে ছাত্রলীগের সব নেতাকর্মী হল ছেড়ে চলে গেছেন। তবে ছাত্রলীগ প্রশাসনকে তদন্তের বিষয়ে যে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছে, তা না হলে আবারও নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাসে আসবেন।’

‘আন্দোলন চলবে’ :এদিকে, আবাসিক হলগুলো খালি করার দু’দফা প্রশাসনিক ঘোষণাকে না মেনে আন্দোলনকারীরা এখনও ক্যাম্পাসে অবস্থান করছেন। তারা বলছেন, উপাচার্য বরখাস্ত না হওয়া পর্যন্ত তারা তাদের আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের এক উপপরিদর্শক জানিয়েছেন, এ অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর দেড় শতাধিক এবং বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন আশপাশের এলাকায় আরও দেড় শতাধিক পুলিশ রিজার্ভে রাখা হয়েছে। ওপর মহলের নির্দেশ অনুযায়ী যে কোনো অ্যাকশনে যাওয়ার জন্য তারা প্রস্তুত রয়েছেন।

আজকের কর্মসূচি :গতকাল সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত উপাচার্যের বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ শেষে আন্দোলনের মুখপাত্র দর্শন বিভাগের অধ্যাপক রায়হান রাইন বলেন, ‘উপাচার্যের অপসারণের দাবি পূরণ হওয়া না পর্যন্ত আমরা থামব না।’ পরে রাত ৯টায় সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, আজ সকাল ৯টায় প্রশাসনিক ভবনে তালা দেওয়া হবে। ১২টায় হবে বিক্ষোভ মিছিল। সন্ধ্যা ৬টায় উপাচার্যের বাসভবনের সামনে হবে অ্যাকুয়াস্টিক কনসার্ট।

ক্যাম্পাসে অবস্থানের বিষয়ে আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ছাত্র ইউনিয়ন জাবি সংসদের সভাপতি নজির আমিন চৌধুরী জয় বলেন, ‘চেষ্টা করব হলে অবস্থান করার। তবে প্রশাসন যদি থাকতে না দেয়, তবে রাতের মতো ক্যাম্পাস ত্যাগ করব। পরদিন আবার ক্যাম্পাসে এসে আন্দোলনে যোগ দেব।’ সরেজমিন দেখা যায়, গতকাল রাত ১১টা পর্যন্ত পুরাতন রেজিস্ট্রার ভবনের সামনে অবস্থান করেন আন্দোলনকারীরা।

SHARE