পলিটেকনিকে ছাত্রলীগের টর্চার সেল , গ্রেফতার পাঁচ, সৌরভকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার

147

স্টাফ রিপোর্টার: অধ্যক্ষকে টেনেহিঁচড়ে পুকুরের পানিতে ফেলে দেয়াকে কেন্দ্র করে রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। আর ন্যাক্কারজনক এই ঘটনা তদন্তে এসে ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের একটি একটি টর্চার সেল পেয়েছে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের তদন্ত কমিটি। এদিকে, লাঞ্ছিত এবং পানিতে ফেলে হত্যা চেষ্টার অভিযোগে অধ্যক্ষ প্রকৌশলী ফরিদ উদ্দিন আহমেদের দায়ের করা মামলায় পাঁচ শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এরা হলো, ছাত্রলীগের কর্মী শাফি শাহরিয়ার (২৩), সোহেল রানা (২২), বাঁধন রায় (২০), আরিফুল ইসলাম (২৩) ও রিপন আলী (২১)। এদের মধ্যে সোহেল রানা সিরাজগঞ্জের খাসকাউনিয়া গ্রামের আবদুল খালেকের ছেলে। আরিফুল ইসলাম নড়াইলের নড়াগাছি থানার কলাবাড়ীয়া গ্রামের ফরিদ আলীর ছেলে। শাফি শাহারিয়ার নওগাঁর মান্দা উপজেলার কসোব খাজুরিয়াপাড়া গ্রামের মৃত আফসার আলীর ছেলে। বাঁধন নীলফামারি সদর উপজেলার ধোপাডাঙ্গা গ্রামের গোপাল রায়ের ছেলে। আর রিপন রাজশাহী মহানগরীর আসাম কলোনি মহল্লার রেজাউল করিমের ছেলে। তারা সবাই পলিটেকনিকের ছাত্র। নগরীর চন্দ্রিমা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মো. গোলাম মোস্তফা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে শনিবার রাত থেকে রোববার ভোর পর্যন্ত নগরীর বিভিন্ন ছাত্রাবাসে অভিযান চালিয়ে ২৬ জনকে আটক করা হয়। এদের মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। বাকিদের ছেড়ে দেয়া হয়েছে। গ্রেপ্তার পাঁচজনকে গতকাল আদালতের মাধ্যমে কারাগারেও পাঠানো হয়েছে। পরবর্তীতে তাদের রিমান্ডের আবেদন করা হবে। এদিকে, অধ্যক্ষকে লাঞ্ছিত ও পানিতে ফেলে দেয়ার প্রতিবাদে গতকাল বেলা ১১টায় পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট সংলগ্ন রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়কে শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করেছেন। রাজশাহী পলিটেকনিকের শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা ছাড়াও আশপাশের বিভিন্ন কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা এতে অংশ নিয়ে বক্তব্য দেন। তারা ওই ঘটনার তীব্র নিন্দা এবং প্রতিবাদ জানান। মানববন্ধন শেষে ৬ দফা দাবিতে বিক্ষোভ করেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। দাবিগুলো হলো- অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের দ্রুত ও সুষ্ঠু বিচার, তাদের স্থায়ীভাবে ছাত্রত্ব বাতিল, ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ, কলেজে বহিরাগত শিক্ষার্থীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ, ক্যাম্পাসে সকলের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত। দাবি পূরণ না হলে তারা আন্দোলনে নামার ঘোষণা দিয়েছেন। মহাসড়কে মানববন্ধন শেষে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের দাবি জানিয়ে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন। এই প্রতিবাদ-সমাবেশের কারণে গতকাল ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক কাজকর্ম হয়নি। প্রতিষ্ঠানটিতে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে পুলিশ থাকছে ক্যাম্পাসে। এদিকে সকালে রাজশাহী মহানগর পুলিশের (আরএমপি) কমিশনার হুমায়ুন কবির রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে গিয়ে ভুক্তভোগী অধ্যক্ষের সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি তাকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ^াস দিয়েছেন। দ্রুততম সময়ের মধ্যে জড়িত ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। এদিকে, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ছাত্রলীগের একটি টর্চার সেলের সন্ধান পাওয়া গেছে। অধ্যক্ষকে লাঞ্ছিত এবং পুকুরে ফেলে দেয়ার ঘটনায় কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের গঠিত কমিটির সদস্যরা এ টর্চার সেলের সন্ধান পেয়েছেন। গতকাল বিকালে তদন্ত কমিটির সদস্যরা তদন্ত চলাকালে এ টর্চার সেলের সন্ধান পান। এ সময় তদন্ত কমিটির সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শনসহ অধ্যক্ষ, শিক্ষক ও ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলেন এবং সিসিটিভির ফুটেজ দেখেন। রাজশাহী পলিটেকনিকের পুকুরের পশ্চিম পাশের ভবনের ১১১৯ নম্বর কক্ষে এ টর্চার সেল থেকে লোহার রড, পাইপ ও লাঠি উদ্ধার করা হয়েছে। পরে সেগুলো পুলিশ হেফাজতে দেয়া হয়। এ সময় তদন্ত কমিটির কাছে কয়েকজন শিক্ষক ও ছাত্র জানান, ওই টর্চার সেলটি ছাত্রলীগের। ওই কক্ষের সামনে ছাত্রলীগের টেন্ট। ছাত্রলীগের নেতাদের কথা না শুনলে সেখানে নিয়ে শিক্ষার্থীদের টর্চার করা হয়। এছাড়াও এসময় ইংরেজি বিভাগের এক শিক্ষক এবং অধ্যক্ষ ফরিদ উদ্দিন তদন্ত কমিটির সাথে কথা বলেন। অধ্যক্ষকে লাঞ্ছিত এবং পুকুরে ফেলে দেয়ার ঘটনায় কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) সাক্ষরিত এক পত্রে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের আরেক পরিচালক (পিআইডব্লিউ) এসএম ফেরদৌস আলমকে তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয়েছে। এছাড়া কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরিচালক (কারিকুলাম) ড. নুরুল ইসলাম এবং রাজশাহী মহিলা পলিকেনিক ইনস্টিটিউটের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ওমর ফারুককে কমিটির সদস্য করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির আহবায়ক এসএম ফেরদৌস আলম বলেন, সকালে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। বিকেলে আমরা দুইজন ঢাকা থেকে বিমানে রাজশাহী এসেছি। আর কমিটির অপর সদস্য রাজশাহীতে ছিলেন। রাজশাহী পৌঁছেই আমরা তদন্ত শুরু করেছি। তদন্ত করে তিনদিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে। টর্চার সেল নিয়ে প্রশ্নের জবাবে ফেরদৌস আলম বলেন, সব বিষয় আমরা তদন্ত করছি। অধ্যক্ষ, শিক্ষক ও ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলছি। পরিপূর্ণ তদন্তের পরেই কারিগরি শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক রওনক মাহমুদের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে। তদন্ত কমিটির সামনে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক নূর উল্লাহ জানান, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাসে একটি নির্দিষ্ট চত্বরে বসে এবং বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে নিরীহ শিক্ষার্থীদের প্রায়ই মারধর করে। এর আগে এক শিক্ষার্থীকে নির্যাতনের প্রতিবাদ করায় তার ওপরও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আক্রমণ চালায়। পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনে বাধা দিলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা শিক্ষকদের চেয়ার তুলে মারতে আসে। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন অবৈধ দাবি নিয়ে সবসময় ঝামেলা করে বলে অভিযোগ করেছেন প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ ফরিদ উদ্দিন। তিনি তদন্ত কমিটির সামনে বলেন, পরীক্ষায় শূন্য পেলেও পাস করিয়ে দিতে হবে, একদিনও ক্লাসে আসেনি এমন শিক্ষার্থীকে পরীক্ষায় বসার অনুমতি দিতে হবে, এমন সব অযৌক্তিক দাবি করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। ছাত্রলীগের ছেলেরা কেউই ক্লাস করে না। প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত পোশাকও পরে না। অধ্যক্ষ ফরিদ উদ্দিন বলেন, ১১১৯ নম্বর কক্ষটি জোর করে নিয়ে ছাত্রলীগের ছেলেরা ব্যবহার করে। সেখানে বসে তারা বিভিন্ন সময় আড্ডা বা মিটিং করে। তবে শুনেছি তারা ওই কক্ষটি টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহার করে। তবে এ নিয়ে কেউ কোনদিন তার কাছে অভিযোগ করেনি। ছাত্রলীগের ছেলেদের বিরুদ্ধে শিক্ষক বা ছাত্র সবাই অভিযোগ দিতে ভয় পান বলে এ সময় জানান তিনি। প্রসঙ্গত, মিডটার্ম পরীক্ষায় ফেল এবং ক্লাশে অনুপস্থিত থাকা পলিটেকনিক শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক কামাল হোসেন সৌরভকে ফাইনাল পরীক্ষায় সুযোগ দেয়ার জন্য গত শনিবার দুপুরে নেতাকর্মীরা অধ্যক্ষ ফরিদ উদ্দিন আহমেদের কার্যালয়ে গিয়ে তাকে চাপ দেন। এ নিয়ে অধ্যক্ষের সঙ্গে তাদের তর্কবিতর্ক হয়। এর জের ধরে দুপুরে ছাত্রলীগ নেতা সৌরভ এবং তার সহযোগীরা অধ্যক্ষকে টেনেহিঁচড়ে ক্যাম্পাসের ভেতরের একটি পুকুরের পানিতে ফেলে দেয়। অধ্যক্ষ তখন মসজিদ থেকে নামাজ পড়ে নিজের কার্যালয়ের দিকে যাচ্ছিলেন। সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, অন্তত ১০ জন তরুণ অধ্যক্ষকে দ্রুতগতিতে পুকুরের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। কেউ অধ্যক্ষের হাত ধরে টানছিল আবার কেউ পেছন থেকে ধাক্কা দিচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যেই অধ্যক্ষকে পুকুরে ফেলে দিয়ে তারা পালিয়ে যায়। পরে ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা গিয়ে অধ্যক্ষকে পুকুর থেকে টেনে তোলেন। এ ঘটনায় রাতে চন্দ্রিমা থানায় মামলা করেন অধ্যক্ষ। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে এতে সাতজনের নাম উল্লেখ করা হয়। এরা হলো- প্রতিষ্ঠানটির কম্পিউটার বিভাগের অষ্টম পর্বের ছাত্র কামাল হোসেন সৌরভ, ইলেকট্রনিক্সের পঞ্চম পর্বের মুরাদ, পাওয়ারের সাবেক ছাত্র শান্ত, ইলেক্ট্র্যিালের সাবেক ছাত্র বনি, মেকাট্রনিক্সের সাবেক ছাত্র হাসিবুল ইসলাম শান্ত, ইলেকট্রমেডিক্যালের সাবেক ছাত্র সালমান টনি, এই বিভাগের সপ্তম পর্বের ছাত্র হাসিবুল এবং কম্পিউটারের সাবেক ছাত্র মারুফ। বাকি আসামিরা অজ্ঞাত। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা চন্দ্রিমা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) তৌহিদুর রহমান জানান, পুকুরে ফেলে দেয়ার সময় সিসিটিভি ফুটেজে সাতজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। এদের কাউকেই গ্রেপ্তার করা যায়নি। তবে গ্রেপ্তার রিপন আলী অধ্যক্ষের কার্যালয়ে গিয়ে তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছিল। তাকে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকিরাও দ্রুত সময়ের মধ্যে ধরা পড়বে বলে আশা তার। এদিকে অধ্যক্ষ লাঞ্ছিত এবং পুকুরের পানিতে ফেলে দেয়ার ঘটনায় নেতৃত্ব দানকারী ছাত্রলীগ নেতা কামাল হোসেন সৌরভকে দল থেকে স্থায়ী বহিষ্কারের সুপারিশ করা হয়। শনিবার রাতেই রাজশাহী মহানগর ছাত্রলীগের এক জরুরি সভায় এই সিদ্ধান্ত হয়। সভা শেষে রাতেই সুপারিশ পাঠানো হয়েছে কেন্দ্রীয় কমিটিতে। গতকাল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে কেন্দ্রীয় কমিটি ছাত্রলীগ নেতা সৌরভকে স্থায়ী বহিষ্কারের কথা জানায়। একইসঙ্গে রাজশাহী পলিটেকনিকে ছাত্রলীগের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। নগর ছাত্রলীগের সভাপতি রকি কুমার ঘোষ জানান, সিসিটিভির ফুটেজে সৌরভকে দেখা গেছে। এইজন্য তার বিরুদ্ধে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের দাবিতে কেন্দ্রীয় কমিটিতে সুপারিশ করা হয়েছিলো। তারই প্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় কমিটি তাকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করেছে। এছাড়া পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট শাখার কমিটিও স্থগিত করা হয়েছে।

SHARE