দুই বছরের জন্য নিষিদ্ধ সাকিব

149

গণধ্বনি ডেস্ক : সাকিব আল হাসানকে সবধরনের ক্রিকেট থেকে দুই বছরের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)। দুই বছরের মধ্যে এক বছর পুরোপুরি নিষিদ্ধ, আর বাকি এক বছর স্থগিত নিষেধাজ্ঞা অর্থাৎ খেলতে পারবেন কিন্তু আবারও অপরাধ করলে শাস্তি পেতে হবে।

সকাল থেকেই বিসিবি কার্যালয়ে থমথমে পরিস্থিতি। দুপুরের পরপর এসে পৌঁছালেন বিসিবি সভাপতি ও পরিচালকরা। সন্ধ্যা থেকে এক দল ভক্ত জড়ো হয়ে শুরু করলেন মিছিল। সব ক্যামেরা বিসিবির প্রধান গেটে রইল তার অপেক্ষায়। কিন্তু তিনি সকলের চোখ এড়িয়ে আরেকটি গেট দিয়ে ঢুকে পড়লেন বিসিবি কার্যালয়ে। ভক্তরা তার পরও চালিয়ে গেলেন সে­াগান—সাকিবের নিষেধাজ্ঞা মানি না, মানব না।

না মানলেও সেই নিষেধাজ্ঞা আইসিসি ঘোষণা করেই দিল। গতকালই এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে আইসিসি জানিয়ে দিল জুয়ারিদের কাছ থেকে প্রস্তাব পেয়েও তাদের দুর্নীতি দমন ইউনিটকে (আকসু) না জানানোয় দুই বছরের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে বাংলাদেশের টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক সাকিব আল হাসানকে। এর মধ্যে এক বছরের নিষেধাজ্ঞা গতকাল থেকেই কার্যকর হয়েছে। আর এই এক বছরে নতুন কোনো অপরাধ না করলে বাকি এক বছর নিষেধাজ্ঞা কাটাতে হবে না।

গতকাল রাতে বোর্ডের সঙ্গে আলোচনার পর আর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপ করেননি সাকিব। তিনি আইসিসিকে দেওয়া বিবৃতিটাই আবার বলেছেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘আমি যে খেলাটি ভালোবাসি, সেটা থেকে নিষিদ্ধ হওয়াটা অবশ্যই দুঃখের। কিন্তু আমি এই প্রস্তাবগুলো (আকসুকে) না জানানোর দায়ে আমার সব শাস্তি মেনে নিয়েছি।’

এরপর সাকিব বলেছেন, তিনি ক্রিকেটকে দুর্নীতিমুক্ত রাখার লক্ষ্যে আইসিসির সঙ্গে কাজ করবেন। তিনি বলেন, ‘বেশির ভাগ খেলোয়াড় ও সমর্থকের মতো আমিও এই খেলাটাকে দুর্নীতিমুক্ত দেখতে চাই। আমি সে জন্য আইসিসির সঙ্গে তাদের শিক্ষা কার্যক্রমে কাজ করার জন্য মুখিয়ে আছি। আমি চাই, কোনো তরুণ খেলোয়াড় যেন আমার মতো ভুল না করে।’

সাকিবের সঙ্গে আলোচনার পর বোর্ড সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন পুরো ব্যাপারে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা শকড। এর চেয়ে বড়ো শকিং ব্যাপার আর নেই। দু’জন খেলোয়াড়ের বদলি হয় না— অধিনায়ক মাশরাফি আর খেলোয়াড় সাকিব। ওর খেলতে না পারাটাই শকিং। ভারতের গুরুত্বপূর্ণ সিরিজ। ওকে নিয়েই সব পরিকল্পনা করা হয়েছে।’

পাপন বললেন, ‘প্রথম শুনে আমি ওর উপর রাগ করেছিলাম। পরে আমি সাকিবের সরলতায় খুশি হয়েছি। এই কারণে খুশি হয়েছি যে, সাকিব আকসুকে পুরো সহায়তা করেছে। সব স্বীকার করে নিয়েছে। জানুয়ারি থেকে তদন্ত চলছিল। আমরা কিছুই জানতাম না। সাকিবই প্রথম আমাদের ধর্মঘটের পর এটা জানায়।’

সবমিলিয়ে পাপন মনে করেন, ‘সাকিব খুব দ্রুতই আবার খেলায় ফিরে আসবেন। আমরা সাকিবের পাশে থাকব। বিসিবি তাকে সবসময় সাপোর্ট দেবে। ওর ভেঙে পড়ার কোনো কারণ নেই। ও দ্রুতই আশা করি খেলায় ফিরে আসবে।’

সাকিবের বিপক্ষে জুয়ারিদের সঙ্গে কথোপকথনের বিস্তারিত উলে­খ করা হয়েছে আইসিসির তদন্ত প্রতিবেদনে। সেখানে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন ম্যাচের আগে-পরে বাজিকরদের সঙ্গে কথা হয় সাকিবের। কিন্তু একবারও সাকিব এই বিষয়ে কাউকে কিছু জানাননি।

২০১৮ সালের বাংলাদেশ, জিম্বাবুয়ে ও শ্রীলঙ্কাকে নিয়ে আয়োজিত ত্রিদেশীয় সিরিজে প্রথমবার সাকিবের সঙ্গে বাজিকরদের কথোপকথন হয়। সেখানে সাকিবকে দলের বিস্তারিত ও নানা কিছু জানাতে বলা হয়। এরপর কীভাবে টাকা পরিশোধ করা হবে, সে নিয়েও ম্যাসেজ দেওয়া হয় তাকে। সাকিবকে বিট কয়েন নিয়ে ধারণা দেন আগারওয়াল নামের এই জুয়ারি।

একই বছর আইপিএলের দুটি ম্যাচে একই কাজ করেন তিনি। সাকিব এর মধ্যে জুয়ারিদের প্রত্যাখ্যানও করেন। আর এসব তথ্য জানতে পেরেই তদন্ত শুরু করে আকসু। আকসুর তদন্তে দারুণ সহায়তা করেন সাকিব। যেটা আইসিসি তার সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উলে­খ করেছে। আর সে জন্যই দুই পক্ষ আলোচনা করে এই শাস্তি ঠিক করেছে। যে কারণে এই শাস্তির বিপক্ষে সাকিব আপিল করবেন না।

আইসিসির মহাব্যবস্থাপক যা বলেছেন : আইসিসির মহাব্যবস্থাপক অ্যালেক্স মার্শাল বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘সাকিব আল হাসান একজন অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার। আইসিসির করা অনেক দুর্নীতি বিরোধী প্রোগ্রামে উপস্থিত ছিলো সে। সকল নিয়মকানুন ভালোই জানা রয়েছে তার। তবুও সে তিনটি প্রস্তাবের কথা গোপন রেখেছে। এসব বিষয়ে তাত্ক্ষণিকভাবেই জানানো উচিত্ ছিল।’ আইসিসির মহাব্যবস্থাপক আরও বলেন, ‘সাকিব তার নিজের ভুলগুলো মেনে নিয়েছে এবং তদন্তের স্বার্থে সম্পূর্ণ সহায়তা করেছে। এমনকি ভবিষ্যতে অ্যান্টি করাপশন ইউনিটের সঙ্গে কাজ করার প্রস্তাব দিয়েছে। যাতে করে তরুণ খেলোয়াড়রা এ ভুল করতে না পারে। আমি তার এই প্রস্তাবে খুশি।’

শাস্তি এক বছরের মধ্যে রাখতে যা করতে হবে সাকিবকে : সব ফরম্যাটে বাংলাদেশের মূল ভরসা সাকিবকে পুরো এক বছর পাবে না দল। এ সময়ে ভারত সফর তো আছেই। আছে পাকিস্তান, অস্টেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজ। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রথম পর্বটাও সাকিবকে ছাড়া কাটাতে হবে বাংলাদেশকে। সব মিলিয়ে ৩৬টি ম্যাচে সাকিবকে পাবে না বাংলাদেশ। সব ধরনের ক্রিকেটে নিষিদ্ধ হওয়ায় স্থানীয় ক্রিকেটেও খেলতে পারার কথা নয়। ফলে নিষেধাজ্ঞা শেষেই সরাসরি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরা কঠিন হবে।

সাকিবের প্রত্যাবর্তনের দিন ঠিক হয়েছে ২০২০ সালের ২৯ অক্টোবর। তবে স্থগিত নিষেধাজ্ঞার কথা ভুললে চলবে না। আগামী এক বছর সাকিবের ওপর কড়া নজরদারি করা হবে। কিছু ব্যত্যয় হলেই নিষেধাজ্ঞা এক থেকে দুই বছর হয়ে যাবে। এই স্থগিত নিষেধাজ্ঞা যেন বাস্তবে রূপ না নেয়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে সাকিবকে। উপায়টা আইসিসিই বলে দিয়েছে। আইসিসির দেওয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, স্থগিত ১২ মাসের নিষেধাজ্ঞা যেন কার্যকর না হয় সেটা নিশ্চিত করতে হলে সাকিব আল হাসানকে দুটো শর্ত পূরণ করতে হবে। প্রথমত. নিষেধাজ্ঞার সময় আইসিসির দুর্নীতি দমন বিভাগের আইন বা কোনো দেশেরই দুর্নীতি বিরোধী আইন ভাঙা যাবে না। এবং দ্বিতীয়ত. আইসিসি যেভাবে বলে দেবে ঠিক সেভাবে বিভিন্ন দুর্নীতি বিরোধী শিক্ষাকার্যক্রম ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় স্বেচ্ছায় ও পরিপূর্ণভাবে অংশ নিতে হবে। এ দুটি শর্ত পূরণ হলেই এক বছরেই শেষ হবে সাকিবের নিষেধাজ্ঞা।

দেশের অনেক বড় ক্ষতি হলো : আগামী এক বছর সাকিব আল হাসানের ‘সার্ভিস’ পাবে না বাংলাদেশ। এটাকে দেশের জন্য অনেক বড় ক্ষতি হিসেবে দেখছেন সাবেক তিন ক্রিকেটার মিনহাজুল আবেদীন নান্নু, আকরাম খান ও হাবিবুল বাশার সুমন।

মিনহাজুল আবেদীন নান্নু বলেছেন, ‘সাকিবের নিষেধাজ্ঞা অবশ্যই দেশের অনেক বড় ক্ষতি। পুরো এক বছর আমরা আমাদের সেরা খেলোয়াড়কে পাবো না। অবশ্যই খারাপ লাগার ব্যাপার।’ আইসিসি ট্রফি জয়ী অধিনায়ক ও বিসিবির ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের চেয়ারম্যান আকরাম খানের বক্তব্য, ‘আমার খুবই খারাপ লাগছে। অনেক দিন পর আমরা ভারত সফরে যাচ্ছি। কিন্তু সেখানে আমরা সাকিবকে পাচ্ছি না। এর চেয়ে হতাশাজনক আর কিছু হতে পারে না। আমরা সাকিবের পাশে আছি, সাকিব আমাদের কাছ থেকে সবসময় সহযোগিতা পাবে।’ আর সাবেক অধিনায়ক ও নির্বাচক হাবিবুল বাশার সুমনের বিশ্বাস সাকিব খুব শক্তভাবেই ফিরে আসবেন। তিনি বলেছেন, ‘সত্যিই হতাশাজনক। সাকিবকে পুরো এক বছর মিস করব। ও (সাকিব) চ্যাম্পিয়ন খেলোয়াড়, আশা করি সে শক্তভাবেই আমাদের মধ্যে ফিরে আসবে।’

SHARE