বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্লাটিনাম জয়ন্তী; গর্বিত ও ধন্য

এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন : রাজনীতি মুলত রাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের পদক্ষেপ। রাজনীতি কার্যত একটি গতি, যা প্রকৃতি থেকে অবিচ্ছেদ্য ও অতি অবশ্যই মানুষের মনের সবচেয়ে শক্তিশালী আবেগময় উচ্ছ্বাসের চূড়ান্ত রুপ। রাজনীতি ফলত রাজবুদ্ধি, যা রাজনৈতিক সমাধানের পথ দেখাতে গোষ্ঠিগত উদ্রেক।
এদিকে রাজনৈতিক দল তখনই দাঁড় হচ্ছে, যখন ধরে নেয়া হচ্ছে জনগোষ্ঠী একটি দলের আদর্শিক অবস্থানকে সম্মান জানানোর প্রস্তুতিতে রয়েছে। প্রাসঙ্গিক প্রেক্ষাপটে গণতন্ত্রের অধীনে জনপ্রিয় কোনো দল সর্বদা প্রমাণ করার চেষ্টা করে যে , অপরাপর রাজনৈতিক দলগুলো কিংবা প্রধান প্রতিপক্ষ হয়ে থাকা দলটি দেশ শাসনের জন্য অযোগ্য পর্যায়ে রয়েছে।
প্রচলিত একটি মতবাদ আছে। তা হল, “পার্টি স্পিরিট হল জনশ্রেণির স্বার্থে কিছু অল্প সংখ্যক মানুষের পাগলামি।” সব সময়েই বলি, পাগলামো না থাকলে নতুন কিছু সৃষ্টি হয় না। বিপ্লব করা যায় না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা যেমন ব্যাখা করতে পারবে, কিন্তু পাল্টে ফেলতে হলে রাজনীতিকদের লাগবে। তাঁদের চরিত্রে পাগলামি থাকতে হবে। জনগণের প্রতি নিবেদিত প্রয়াসে যেয়ে উত্তীর্ণ হওয়া রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মধ্যেই রাজনীতির সার্থকতা বটে।
সার্থকতার অনন্য দিক পর্যালোচনা করলে সর্বউদাহরণযোগ্য দল হিসাবে আওয়ামী লীগকে দেখার সুযোগ সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের জনপ্রিয়, শ্রেষ্ঠ এবং ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের জন্ম ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন। দলটির প্রতিষ্ঠাকালীন সকল সদস্যদের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে স্মরণ করছি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। যিনি দল ও দেশের জন্য কালোত্তীর্ণ মহানায়ক, যার আদর্শে অনুরণিত থেকে আমি ও আমরা আওয়ামী লীগের প্লাটিনাম জয়ন্তী পালনের মাহেন্দ্রক্ষণে উপনীত হয়েছি। একই সঙ্গে আমরা গর্বিত ও ধন্য, যখন বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনা আজ আওয়ামী লীগের ও বাংলাদেশের নেতৃত্বে রয়েছেন। খুব ছোট্ট করে আমার বাবা শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামানকেও স্মরণ করছি, যিনি ১৯৭৪ সালে আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসাবে দল পরিচালনার সুযোগ পেয়েছিলেন।
পাগলামোর কথা বলছিলাম। এও সত্য যে, গুটিকয়েক মানুষের তথা কথিত নামধারী কিছু রাজনীতিকদের লাভের জন্যও রাজনৈতিক দলের জন্ম হয়। সেখানেও কয়েকজন ব্যক্তি পাগালামি করে ! পরনে সামরিক পোশাক থাকলেও তাঁদের পাগলামির পেছনে নিজেকে ক্ষমতাধর ঘোষণা করা ছাড়া আর কিছু দেখা যায় কি ? বাংলাদেশে যখন একদিকে জনমানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে, অধিকার আদায়ের দাবীতে আওয়ামী লীগের সংগ্রামী দীর্ঘ পথচলার পথ বিস্তৃত——- অন্যদিকে সুবিধাভোগি হয়ে প্রতিবিপ্লব করে রক্তপাতকে আলিঙ্গন করে কাউকে কাউকে শাসক হতে দেখা গেছে। তাঁদের এমন বিশিষ্টতা, রাজনৈতিক শর্ত পূরণ করে না।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় হালে কয়েকটি রাজনৈতিক দল ভোটের জন্য অতিশয় উদ্বিগ্ন থাকে। কিন্তু তারা ভোটের ময়দানে অনুপস্থিত থাকে। তারা বোঝাতে চায় যে, একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে তারা নাকি জিতবে! অথচ, বিদেশি শক্তির ওপর নির্ভরশীল থাকা এই সকল রাজনৈতিক দলের সাথে, এদের নামধারী রাজনৈতিক নেতাদের সাথে অঞ্চলভিত্তিক মানুষের কোন সু সংযোগই নেই। অসহিষ্ণু এই সকল দলগুলোর প্রতি এখনো আওয়ামী লীগ সহনশীল, যখন তাঁদের ভুল ধরিয়ে দিয়ে আমাদের দলের মুখপাত্রবৃন্দ বলতে চায় যে, জনগণের কথা চিন্তা করে, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ঠিক করে, সু নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে, দলের মধ্যকার অভ্যন্তরীন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে রাজনীতি করুন। নিজ দলের প্লাটিনাম জয়ন্তী ঘিরে দেশের সকল পর্যায়ের রাজনৈতিক দলগুলোকে বলতে চাই যে, নিজেদেরকে প্রমাণ করে আওয়ামী লীগের সাথে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের মাধ্যমে ফলত জনগনের স্বার্থ উদ্ধারে রাজনীতি করুন। এতে করে আপনাদের রাজনীতির ভবিষ্যৎ থাকবে। নতুবা, রাজনৈতিক দল হিসাবে বয়স ৭৫ কিংবা ১০০ পূরণ হবে না।
আওয়ামী লীগের চলার পথের বয়স ও প্লাটিনাম জয়ন্তীর উপলক্ষ একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসাবে আমাকে, শোক থেকে শক্তির প্রেরণা যোগায়। আওয়ামী লীগ, সুচিন্তক একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী হিসাবে বাংলার মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির তাঁবু হিসাবেই যাত্রা শুরু করেছিল। এই দলটির নেতৃবৃন্দকে কার্যত মাতৃভাষার জন্য বিচ্ছিন্ন বিচ্ছিন্ন পন্থায় লড়তে হয়েছিল। পশ্চিম পাকিস্তানের শোষন, শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকে অধিকার আদায়ে লড়তে পারার মত ইতিহাসে একমাত্র দলটার নামই হল আওয়ামী লীগ। ১৯৬২, ১৯৬৬ হয়ে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের মতো প্রেক্ষাপট জনশ্রেণির স্বার্থ উদ্ধারের রাজনীতি ছিল। কেন তা ভুলে যেতে যায় বাংলাদেশের নামধারী রাজনৈতিক দলগুলো ? দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়া দলটির নাম আওয়ামী লীগ।
আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা হিসাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব যখন দেশের সাড়ে ৭ কোটি মানুষকে মুক্তির পথ দেখিয়ে পুরো জাতিকে এককাট্টা করলেন, তখন আমরা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে বিশ্বের বুকে জায়গা নিলাম। সেই হিমালয় পাহাড়সম শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক সত্তাকে রাজনৈতিক অপশক্তি হত্যা করল। আমার বাবা এ এইচ এম কামারুজ্জামানসহ অপরাপর তিন জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ ও মনসুর আলীকে জেলখানায় হত্যা করা হল। বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেসা যেমন বঙ্গবন্ধুর ঘর ও রাজনীতির অন্দর মহলের খবর আগলিয়ে রাখতেন—– ঠিক তদ্রুপ বঙ্গবন্ধু ও চার জাতীয় নেতার হত্যার পর বেগম জোহরা তাজউদ্দীনের আওয়ামী লীগের খন্ডকালীন আহবায়ক হয়ে রাজনীতির ময়দানে টিকে থাকার ওই লড়াইটাকেও আমি মনে রাখি।
এদিকে আমিই সব সময়ে লিখে ও বলে জানাচ্ছি যে, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি নারীর নাম শেখ হাসিনা। কারণ, তাঁর নেতৃত্ব দেয়ার অসাধারণ ক্ষমতা, রাজনৈতিক অপশক্তি মোকাবিলা করার দক্ষতা, দল পরিচালনা করার লক্ষ্যনীয় দিক, মানবিক পর্যালোচনায় বিবেক শ্রেণির প্রতিনিধি হয়ে পড়া—-তাঁকে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করে। তিনি নিজে যেমন পরিবারের প্রায় সবাইকে হারিয়ে শোক কে শক্তিতে রূপান্তরিত করে এমন অর্জনে পৌঁছিয়েছেন, আমিও তেমন আমার বাবাকে হারিয়ে শোকে বিহবল হয়ে একই পন্থায় শক্তি অর্জন করতে সচেষ্ট হয়েছি।
দেশের মানুষের কাছেও আমার আমাদের জিজ্ঞাসা, আমরা কী হারায়নি ? মহান মুক্তিযুদ্ধে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণ দিলেন। বঙ্গবন্ধু থেকে আহসানউল্লাহ মাস্টার ! শীর্ষ পর্যায় হতে তৃণমূলের সব পর্যায়ে আমাদেরকে মারা হয়েছে। ২১ আগস্ট নেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে বর্বোরোচিত গ্রেনেড হামলায় আমরা আইভি রহমানকে কি হারাইনি ? বজ্রকন্ঠের সেই মোহাম্মদ হানিফ ভুক্তভোগী হয়ে আর ফিরতে পারেন নি !
অন্যদিকে ১৯৯০’র স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের প্রধান নেতৃত্বদানকারী দলটির নামও আওয়ামী লীগ। অপরদিকে, রাষ্ট্রীয় সেবা বা ক্ষমতায় থাকার অস্বস্তির দিকও আছে। তা যদি হয় টানা মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা হয় ! মনে রাখতে হবে, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রের জন্যই সুদীর্ঘ সময় ধরে লড়াই করে আসছে, যাবে। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অনুশীলনে থেকে আওয়ামী লীগ এক সময় পাকিস্তানে সত্যিকারের বিরোধী দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের ওপর ভর করে ধর্মনিরপেক্ষ তথা অসম্প্রদায়িক রাজনীতির মধ্য দিয়ে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি কায়েমের দৃষ্টান্ত হয়ে আওয়ামী লীগের আদর্শিক অবস্থান নিশ্চিত হয় বলে মনে করার সুযোগ রয়েছে।। ঘটনা প্রবাহের সাথে তাল মিলিয়ে গোষ্ঠিগত নেতৃত্বের সম্মিলিত সিদ্ধান্তে নিজেদের উপযোগি সিদ্ধান্ত নিতেও আওয়ামী লীগ কার্পণ্য করে না। জনঅনুভুতির আবেগকে আমলে নিতে জানে আওয়ামী লীগ। মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশের জন্য ইসলামের প্রতি মানুষের যে শ্রদ্ধা, তা ধরে রাখতে আওয়ামী লীগ সোচ্চার ছিল, আছে। আবার ধর্মীয় সম্প্রীতির বন্ধনকে শক্ত করে ধরে রাখার দলের নামও আওয়ামী লীগ। দেশের সংখ্যালঘু মানুষগুলোর এই জন্যই আওয়ামী লীগের প্রতি আস্থা আছে বলে অনুমিত হয়।
গ্রিক দার্শনিক প্লেটো সর্বদা তাগিদ রেখে বলতেন, সমাজের নিকৃষ্ট লোক দ্বারা শাসিত হওয়া যাবে না। আওয়ামী লীগ নিকৃষ্ট শাসকশ্রেণির বিরুদ্ধে দাঁড় হয়েই পথচলা আরম্ভ করেছিল। সেই ধারাবাহিকতায় বাংলার মানুষের স্বাধীনতা দিতে নেতৃত্ব দিয়েছিল সেই আওয়ামী লীগ। স্বাধীনতা ছাড়া জীবন আত্মাবিহীন দেহের মতো। প্রচলিত এমন মতবাদে সিক্ত হওয়ার জন্য পেছনের রাস্তাকেও স্মরণ করতে হবে এই দেশের মানুষের। তাঁদেরকে চিন্তা করতে হবে যে, আমরা কেমন ছিলাম ? বাংলাদেশ এগিয়ে গিয়েছে। আওয়ামী লীগ শুধু তাই মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়ে বসে থাকেনি। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়তে ঘুরেফিরে আওয়ামী লীগই দেশটাকে সামনের দিকে নিয়ে গিয়েছে। কৃতিত্ব আওয়ামী লীগের, অতি অবশ্যই দলের সভানেত্রীর। তাঁর অদম্য হয়ে লড়াই করার মানসিকতা আওয়ামী লীগকে সমৃদ্ধ করেছে।
এরিস্টটল বলেছিলেন যে, মানুষ স্বভাবতই রাজনৈতিক জীব। বঙ্গবন্ধু পেরেছিলেন তাঁর দেশের সকল মানুষকে রাজনৈতিক কর্মী তৈরি করতে। আবার আরেকটি মতবাদ আছে। যেমন, রাজনীতি রক্তপাত ছাড়া যুদ্ধ আর যুদ্ধ রক্তপাতের রাজনীতি। শেখ হাসিনা বৈশ্বিক পর্যায়ে বলেন, যুদ্ধ আসলে রাজনৈতিক সমাধানের পথ নয়। তাহলে ধরে নেয়া যায়, শেখ হাসিনা রাজনীতির প্রধান শর্ত পূরণ করে পথ চলতে জানেন।
ভোট হল একটি নাগরিক ধর্মানুষ্ঠান। এমন বিখ্যাত মন্তব্যের পক্ষে আমি। আগামী দিনে বাংলাদেশের মানুষ রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে আওয়ামী লীগের বিচরণ, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সক্ষমতা পরখ করে গণতন্ত্রকে বিজয়ী করুক, এমন স্বপ্নে বিভোর আছি। অর্থাৎ, প্রকারন্তরে একটি বিশেষে পক্ষের জনশ্রেণিকে বলছি, আপনার রুচীর সংকটকে মোকাবিলাকরত একটি দর্পণ দাঁড় করিয়ে নিন। অতঃপর ভাবুন।
নতুন প্রজন্ম রাজনীতি নিয়ে কৌতূহলী হোক। ওরা আওয়ামী লীগের ইতিহাস, বাংলাদেশের ইতিহাস, বঙ্গবন্ধু, জাতীয় চার নেতা, শেখ হাসিনার নেতৃত্ব নিয়ে গবেষণা করুক। দলের প্লাটিনাম জয়ন্তীতে এমন প্রত্যাশা করি। আমরা রাজনীতিকেরাও যেন ওদের সামনে আদর্শ হয়ে থাকতে পারি। আওয়ামী লীগের সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা যেন সমাজের জন্য অনুকরণীয় হয়ে বিচরণ করতে পারে। রাজনীতির দিকে ঝুঁকুন, নতুবা রাজনীতি আপনার দিকে ঝুঁকবে। এমন প্রেক্ষিত তৈরি করার দিকটি, আওয়ামী লীগের আগামী দিনের চ্যালেঞ্জও বটে।

আরও পড়ুনঃ   জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার, তবু মাথা নোয়াবার নয়

লেখক: এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন
সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ
মেয়র, রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন।