যাঁর বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ, তাঁকে পাশে নিয়ে তদন্ত কর্মকর্তার ইফতার

স্টাফ রিপোর্টার : রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার ঝিকড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম একটি হত্যা মামলার আসামি। সেই মামলার তদন্ত চলছে। এর মধ্যেই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক নয়ন হোসেন অভিযুক্ত ব্যক্তিকে পাশে বসিয়ে ইফতার করেছেন। এ অবস্থায় বাদীপক্ষের লোকজন হত্যা মামলার সুষ্ঠু তদন্ত নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

শনিবার বাগমারার যোগীপাড়া পুলিশ ফাঁড়িতে আয়োজন করা হয় এই ইফতার অনুষ্ঠান। সেখানে চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামসহ আরও অনেককে দাওয়াত করা হয়। পুলিশ পরিদর্শক নয়ন হোসেন এই ফাঁড়ির ইনচার্জ ছিলেন। গত ২৮ মার্চ তাঁকে জয়পুরহাটের আক্কেলপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিসেবে বদলি করা হয়েছে। রোববার তিনি জয়পুরহাট চলে গেছেন।

ঝিকড়া ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে সোহাগ হোসেন (২২) নামের এক তরুণকে খুনের অভিযোগ রয়েছে। সোহাগের বাবা শরিফুল ইসলাম গত ১৯ ফেব্রুয়ারি রাজশাহীর বাগমারা থানার আমলি আদালতে একটি হত্যা মামলার আবেদন করেন। তাঁর আবেদনে প্রধান আসামি হিসেবে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামের (৫০) নাম লেখা হয়।

২ নম্বর আসামি করা হয় চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামের ছোট ভাই আসাদুল ইসলামকে (৪৫)। মোট ২৯ জনের বিরুদ্ধে এই মামলা করা হয়। তাঁর বাড়ি যশোরের মনিরামপুর উপজেলার আড়শিংগাড়ি গ্রামে।

শরিফুল ইসলামের ছেলে সোহাগ হোসেন ঢাকায় থাকতেন। সেখানে বাগমারার মরুগ্রাম ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের আনিসুর রহমানের ছেলে মনাহার ইসলামের (২৬) সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। মনাহারের চাচা উপজেলা কৃষক লীগের সদস্য নজরুল ইসলামের সঙ্গে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদের মধ্যে আগে থেকেই বিরোধ ছিল।

গেল জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নজরুল ‘স্বতন্ত্র’ প্রার্থী এনামুল হক এবং আসাদুল দলীয় প্রার্থী আবুল কালাম আজাদের পক্ষে কাজ করেন। ভোটে এনামুল পরাজিত হন। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হয়।

গত ২ ফেব্রুয়ারি সকালে নজরুলের লিজ নেওয়া পুকুরপাড়ে নিজেদের সরিষা খেতে যান মনাহার। এ নিয়ে প্রতিপক্ষ আসাদুলের লোকজন মনাহারের সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে তাঁরা মনাহারকে পিটিয়ে হাত ভেঙে দেন।

আরও পড়ুনঃ   বগুড়ায় বেগুনের কেজি ২ টাকা, তবুও মিলছে না ক্রেতা

বন্ধুর আহত হওয়ার খবর পেয়ে ঢাকা থেকে সোহাগ তাঁর আরও দুই বন্ধুকে নিয়ে মনাহারকে দেখতে আসেন। এ সময় গ্রামে ‘ভাড়াটে সন্ত্রাসী’ আনা হয়েছে অভিযোগ তুলে আসাদের লোকজন ওই তিন তরুণের ওপর হামলা চালায়। এ সময় দুজন পালিয়ে প্রাণে বাঁচলেও মাঠের মধ্যে পিটিয়ে ও কুপিয়ে সোহাগকে হত্যা করা হয়। পরে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে।

এ ঘটনার পর রাতেই নিহত সোহাগের চাচাতো ভাই সাইফুল ইসলাম সাগর বাগমারায় আসেন। সেদিন পুলিশ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে তাঁকে দিয়ে একটি হত্যা মামলা করায়। ওই মামলায় আসামি হিসেবে কারও নাম উল্লেখ না করে জড়িত অনেককে বাঁচানোর চেষ্টার অভিযোগ তোলেন সোহাগের বাবা শরিফুল ইসলাম। পরে ১৯ ফেব্রুয়ারি তিনি ২৯ জনের নাম উল্লেখ করে আদালতে হত্যা মামলা করার আরজি জমা দেন।

আদালত তাঁর আরজি গ্রহণ করেছেন। তবে একই ঘটনায় দুজন বাদী হয়ে আলাদা মামলা করা যায় না বলে আদালত আগের মামলাটির সঙ্গেই নতুন মামলাটির তদন্ত করে একসঙ্গেই প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেন। মামলাটি তদন্ত করছিলেন যোগীপাড়া পুলিশ ফাঁড়ি থেকে সদ্য বদলি হওয়া ইনচার্জ নয়ন হোসেন। আর তিনিই নিহত সোহাগের বাবার দায়ের করা মামলার প্রধান আসামির সঙ্গে ইফতার করেছেন।

এই খুনের ঘটনায় পুলিশ দুজন এবং র‍্যাব দুজন আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তার এই চার আসামিই নিহত সোহাগের বাবার দায়ের করা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি। তবে এই মামলার প্রধান আসামি রফিকুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করেনি পুলিশ। উল্টো তাঁকে দাওয়াত দিয়ে এনে পাশে বসিয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ইফতার করার কারণে হতাশ সোহাগের পরিবার।

প্রথম মামলার বাদী ও নিহত সোহাগের চাচাতো ভাই সাইফুল ইসলাম সাগর বলেন, ‘প্রথম মামলায়ও আমি আসামিদের নাম দিতে চেয়েছিলাম। চেয়ারম্যান রফিকুলসহ অন্য আসামিদের নাম লিখে নিয়ে গিয়েছিলাম। পুলিশ সেটা ছিঁড়ে ফেলে। এরপর সাদা কাগজে সই নিয়ে পুলিশ নিজেদের মতো করে এজাহার লেখে। সেখানে কাউকে আসামি করা হয়নি। তাই আমার চাচা আসামিদের নামসহ আদালতে একটা মামলা করেছেন। আদালত দুই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন একসঙ্গে দিতে বলেছেন।’

আরও পড়ুনঃ   শেষ হলো দুই সিটিতে ভোটগ্রহণ, চলছে গণনা

সোহাগের চাচাতো ভাই সাইফুল ইসলাম সাগর আরও বলেন, ‘আমাদের চোখে এই হত্যাকাণ্ডের প্রধান অভিযুক্ত ব্যক্তি রফিকুল চেয়ারম্যান। তাঁর সঙ্গে তদন্ত কর্মকর্তার ইফতার দুঃখজনক।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের বাড়ি অনেক দূরে। সব সময় তদন্ত কর্মকর্তার কাছে যেতে পারি না। প্রথম প্রথম তিনি আমাদের ফোন ধরতেন। কথা শুনতেন। পরে ফোন দিলে কেটে দেন। আমরা শুনেছি, আসামিরা পুলিশকে ৩০ লাখ টাকা দিয়েছে। তারপর থেকে আমাদের কল ধরে না। এখন ন্যায়বিচার পাব কি না, জানি না। আমরা ভাই হত্যার বিচার চাই।’

যাঁর বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ, তাঁকে নিয়েই তদন্ত কর্মকর্তার ইফতারের বিষয়ে জানতে চাইলে বাগমারা থানার ওসি অরবিন্দ সরকার বলেন, ‘রফিকুল ইসলাম জনপ্রতিনিধি বলে হয়তো তাঁকে ইফতারে দাওয়াত দেওয়া হয়েছিল। তিনি সত্যিই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকলে গ্রেপ্তার করা যাবে। আসামিপক্ষের কাছ থেকে পুলিশ কোনো ঘুষ নেয়নি। সঠিকভাবেই তদন্ত চলছে।’

পুলিশ পরিদর্শক নয়ন হোসেন বলেন, ‘দ্বিতীয় মামলাটা আলাদা করে এজাহার হিসেবে রেকর্ড করা হয়নি। আদালত বলেছেন, প্রথম মামলার সঙ্গেই যেন এটার প্রতিবেদন দেওয়া হয়। সেভাবেই তদন্ত করছিলাম। ইতিমধ্যে আমার বদলি হয়ে গেছে। চলে যাওয়ার আগে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে ইফতার করেছি। চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামকেও দাওয়াত দেওয়া হয়েছিল। আমি চলে এসেছি। এখন হত্যাকাণ্ডে তাঁর সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে পরবর্তী তদন্ত কর্মকর্তা তাঁকে গ্রেপ্তার করবেন। এটা কোনো সমস্যা না।’

ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমাকে ষড়যন্ত্রমূলক হুকুমের আসামি করা হয়েছে। সেই মামলা তদন্তাধীন। আমি তো ঘটনার সঙ্গে জড়িত নই। তাহলে তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে ইফতার তো করতেই পারি।’

রাজশাহী জেলা পুলিশের মুখপাত্র বিশেষ শাখার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘যাঁর বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ আছে, তাঁর সঙ্গে ইফতার করে তদন্ত কর্মকর্তা ঠিক করেনননি। তদন্ত কর্মকর্তা বদলি হয়ে গেলেও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখব।’