ইউএস অ্যাগ্রিমেন্ট অ্যাপের প্রতারণার মূলহোতা মাহাদি

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৩৩:৩৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৪ ০ বার পড়া হয়েছে
আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

স্টাফ রিপোর্টার: বিদেশী প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের নামে বিপুল টাকা হাতিয়ে নেওয়া অ্যাপ ইউএস অ্যাগ্রিমেন্টের নাটের গুরু মাহাদি ইসলাম (৩৩)। আগে তার নাম ছিল সজিব কুমার ভৌমিক। ২০১৮ সালে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর তিনি মাহাদি নাম ধারণ করেন। ২০১৪ সাল থেকেই একের পর এক অ্যাপ খুলে অনলাইনে তার প্রতারণা চলছে। সবশেষ ইউএস অ্যাগ্রিমেন্ট অ্যাপ প্রায় দুই হাজার মানুষের ৩০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাহাদির বাবার নাম মিন্টু কুমার ভৌমিক। বাড়ি নোয়াখালী সদর উপজেলার মাইজদী এলাকায়। এলাকায় কয়েকটি প্রতারণার মামলার আসামি হয়ে ২০১৭ সালের দিকে স্বপরিবারে চলে আসেন ঢাকায়। থাকতে শুরু করেন বনশ্রীর সি ব্লকের একটি বাসায়। ইউএস অ্যাগ্রিমেন্টের কেলেঙ্কারীর পর তিনি এখন লোকচক্ষুর আড়ালে। তবে এখনও ‘প্রো উইন ইএক্স’ নামে মাহাদীর একটি অ্যাপের কার্যক্রম চলছে। হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে টাকা।

ইউএস অ্যাগ্রিমেন্টের মাধ্যমে প্রতারণার অভিযোগে গত ১৭ জানুয়ারি রাজশাহীর রাজপাড়া থানায় একটি মামলা হয়। মামলায় পাঁচজনকে আসামি করা হয়। তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এ মামলায় অবশ্য মাহাদির নাম ছিল না। পরে ২৩ জানুয়ারি রাজশাহীর গোদাগাড়ী থানায় আরেকটি মামলা হয়। এ মামলায় আগের পাঁচজন ছাড়াও মাহাদিকে আসামি করা হয়।

প্রথম মামলার বাদী মোস্তাক হোসেন জানান, টাকা ফেরত না পেলে মামলা করবেন জানালে চতুর মাহাদিই তাকে সব তথ্য দিয়ে সহযোগিতার কথা বলেন। এ জন্য তাকে আসামি না করার অনুরোধ করেন। পরে তারা জেনেছেন, ওই মাহাদিই অ্যাপের পরিচালক। তাই পরে আরেক ভুক্তভোগীর মামলায় তাকে আসামি করা হয়েছে।

এই প্রতারণার বিষয়ে প্রথম মামলার পাঁচ আসামির মধ্যে তিনজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়েছে। হোয়াটসঅ্যাপে রাজশাহী বিভাগীয় প্রধান মো. ওয়াহেদুজ্জামান সোহাগ দাবি করেন, বিদেশী অ্যাপের কাজ জানিয়ে মাহাদি তার সঙ্গেই প্রতারণা করেছেন। গ্রাহকদের কাছ থেকে তিনি যে টাকা তুলেছেন তা হাতিয়ে নিয়েছেন মাহাদি। এখন সোহাগ ভারতে পালিয়ে আছেন।

সোহাগের স্ত্রী ও অ্যাপের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক হিসেবে আসামি হওয়া ফাতেমা তুজ জহুরা মিলি আদালতে হাজির হয়ে প্রথম মামলায় জামিন নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তার স্বামী অ্যাপটিকে বিদেশী প্রতিষ্ঠান জেনে চাকরি করতেন। তিনি কিছু জানেন না। আর কান্ট্রি ডিরেক্টর হিসেবে আসামি হওয়া মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের ফারুক হোসাইন সুজন দাবি করেন, তার কাছ থেকেই টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন মাহাদি। টাকা ফেরত না দিতে তাকেও আসামি হিসেবে ফাঁসিয়েছেন। ফারুক হোসাইন সুজন এ সংক্রান্ত কিছু কাগজপত্রও পাঠান।

ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, ২০১৪ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত সজিব কুমার ভৌমিক ওরফে মাহাদি নোয়াখালীতে ‘ট্রেড টুডে’ নামের একটি অ্যাপ চালাতেন। এই অ্যাপের মাধ্যমে নিজ এলাকার মানুষের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেন। এ নিয়ে তার বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলা হয়। তখন বাবা-মা ও ভাইকে সঙ্গে নিয়েই ঢাকায় পালিয়ে আসেন সজিব। তারা বনশ্রীর সি ব্লকের একটি বাসায় ভাড়া ওঠেন। প্রতারণা করে হাতিয়ে নেওয়া প্রচুর টাকা হাতে থাকায় তারা পুলিশ প্লাজার পাশে ‘ডক্টর মেডিসিন ফার্মা’ নামের একটি ওষুধের দোকান কিনে নেন। কিন্তু ফার্মেসি চালানোর মতো অভিজ্ঞতা তাদের ছিল না। তাই চন্দন নামে অন্য একটি দোকানের কর্মচারীকে বেশি বেতন দিয়ে নিজেদের দোকানে লাগান।

অভিযোগ আছে, এই দোকান দেখিয়ে আশপাশের লোকজনের কাছ থেকে প্রচুর টাকা হাতিয়ে নেন সজিবের বাবা মিন্টু কুমার ভৌমিক। আর সজিব ওরফে মাহাদি ‘ফরেক্স মার্কেট ইউএস ডটকম’ নামে আরেকটি অ্যাপ খোলেন। এই অ্যাপের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন নোয়াখালীর এমদাদুল হক ও মুন্না নামের দুজন। এই অ্যাপের মাধ্যমে ময়মনসিংহ থেকে প্রচুর টাকা হাতিয়ে নেন মাহাদি। সেখানে এজেন্ট ছিলেন মানিক মিয়া। এই অ্যাপের প্রতারণা বুঝতে পেরে ২০২২ সালে মাহাদির বিরুদ্ধে ময়মনসিংহে মামলা হয়। ২০২৩ সালের শুরুর দিকে মাহাদি ও তার পরিবার বনশ্রীর ভাড়া বাসা ও নিজেদের দোকান ফেলে পালিয়ে যান।

বিদেশী অ্যাপে বিনিয়োগের কথা বললেও মাহাদি তার এজেন্টদের কাছ থেকে গ্রাহকের টাকা নিতেন নিজের, বাবার কিংবা ভাইয়ের ব্যাংক হিসাবে। ডাচ বাংলা ব্যাংকে সজিব কুমার ভৌমিক নামে তার নিজের হিসাব নম্বর হলো- ১৬৪১৫৭০০২৬১০৬, বাবা মিন্টু ভৌমিকের নামে হিসাব নম্বর- ৩০৩১৫৭০০০৭১৭৩ ও ভাই রাজীব দেবনাথের নামে হিসাব নম্বর- ৩০৩১৫৭০০০৭১৬৮। ২০২১ সালের একটি ব্যাংক স্টেটমেন্টেই সজিব কুমার ভৌমিকের ব্যক্তিগত হিসাবে ৭১ লাখ ৩৭ হাজার ৫১৮ টাকা লেনদেনের চিত্র দেখা গেছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, নোয়াখালীতে এমএলএম অ্যাপ ট্রেড টুডের মাধ্যমে প্রতারণায় সজিব ওরফে মাহাদির প্রধান সহযোগী ছিলেন জাহাঙ্গীর আলম নামের এক ব্যক্তি। নোয়াখালীতে সজিবের নামে যে মামলা হয় তাতে জাহাঙ্গীরও আসামি হন। পরে তারা দুজনে একসঙ্গেই ঢাকায় পালিয়ে আসেন। পরবর্তীতে জাহাঙ্গীরের স্ত্রী পলি খাতুনের সঙ্গে মাহাদির পরকীয়া প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ২০১৯ সালে বিষয়টি বুঝতে পেরে জাহাঙ্গীর তার স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দুবাই চলে যান। পরের বছর পলিকে বিয়ে করেন মাহাদি। এখন পলিকে নিয়েই আত্মগোপনে তিনি। জাহাঙ্গীর আলম এখনও দুবাইতেই আছেন।

সূত্র বলেছে, সবশেষ ঢাকার সিরাজ মিয়া আর চট্টগ্রামের মোস্তাকিম মিয়া নামের দুজনকে নিয়ে ইউএস অ্যাগ্রিমেন্টের প্রতারণার জাল বিছান মাহাদি। পরে সিরাজকেও দূরে সরিয়ে দেন। এখন শুধু চট্টগ্রামের মোস্তাকিমকে নিয়ে চলছেন। প্রতারণা করে হাতিয়ে নেওয়া বিপুল টাকায় তারা আয়েশী জীবন কাটাচ্ছেন। তারা নিজেরা বাঁচতে ফাঁসিয়ে দিচ্ছেন অনেককেই।

রাজশাহীতে মামলার আসামি হওয়া ফারুক হোসাইন সুজন বলেছেন, সজিব তার প্রথম অ্যাপ ট্রেড টুডের মার্কেটিং করতে শ্রীমঙ্গলে গিয়েছিলেন। প্রলোভনে পড়ে তার এলাকার ছোট ভাই শাহ আলম ৬০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে ফেলেন। তখন টাকা উদ্ধারের জন্য তিনি সজিবের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সজিব তাকে ঢাকায় ডেকে ৪০ হাজার টাকা ফেরত দেন। এরপর সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন। প্রতারণার সময় মানুষের বিশ^াস অর্জনের জন্য সজিব ইসলাম ধর্ম গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। ২০১৮ সালে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। সুজন তার এক আইনজীবী বন্ধুর মাধ্যমে এফিডেফিট করিয়ে দেন।

সজিব ইসলাম গ্রহণ করে নিজের নাম রাখেন মাহাদি ইসলাম। ধর্মান্তরিত হওয়ার কারণে সুজনও তাকে বিশ^াস করতে শুরু করেন। পরে তার কথায় ইউএস অ্যাগ্রিমেন্টে বিনিয়োগ করেন ২০ লাখ টাকা। আত্মীয়-স্বজনকে বিনিয়োগ করান আরও প্রায় ৮০ লাখ টাকা। এই অ্যাপের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য স্ট্যাম্পে চুক্তি করে সুজনের দুটি গাড়িও ভাড়া নেন মাহাদি। তিনি একটি গাড়ি দিয়েছিলেন রাজশাহী বিভাগীয় প্রধান ওয়াহেদুজ্জামান সোহাগকে। সুজন শ্রীমঙ্গলের নিজের ল্যাপটপ ও মোবাইলের দোকান গুটিয়ে টাকা দিয়েছিলেন মাহাদিকে।

সুজন বলেন, একপর্যায়ে তিনি প্রতারণা বুঝতে পারলে টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য মাহাদিকে চাপ দেন। তখন মাহাদি তাকে ৯ লাখ, ৫ লাখ ও ৫ লাখ টাকার তিনটি চেক দেন। মাহাদি ওরফে সজিবের ডাচ বাংলা ব্যাংকে এই হিসাবের নাম ‘এম এইচ ট্রেডার্স’। হিসাব নম্বর- ৩০৩১১০০০০২১৪৪। সুজন পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, ময়মনসিংহের অর্থ কেলেঙ্কারীর পর পুলিশের অনুরোধে এই হিসাব অকার্যকর রেখেছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। তিনি টাকা তুলতে পারেননি।

সুজন বলেন, আমের মৌসুমে বেড়ানোর উদ্দেশ্যে তিনি মাহাদির সঙ্গে একবার রাজশাহী এসেছিলেন। তখন অ্যাপের কয়েকজনের সঙ্গে তার দেখা হয়। আর এ জন্যই তাকে অ্যাপের গুরুত্বপূর্ণ লোক দেখিয়ে মাহাদিই মামলা করিয়েছেন নিজে বাঁচতে এবং পাওনা টাকা না দিতে। এই মামলা হওয়ার পর তিনিও ফেরারি হয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে সজিব কুমার ভৌমিক ওরফে মাহাদি ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তার বাবা মিন্টু কুমার ভৌমিকের মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়া গেছে। তবে সংযোগ পাওয়া গেছে ভাই রাজীব কুমার ভৌমিক ওরফে রাজীব দেবনাথের মোবাইলে। রাজীব বলেন, তিনি এসবের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। এখন বিপর্যস্ত অবস্থায় আছেন। এ সময় তিনি কাঁদতে শুরু করেন এবং ফোনটি কেটে দেন। পরে আবার ফোন করা হলে তিনি ধরেননি।

মাহাদির বিরুদ্ধে হওয়া মামলাটির তদন্ত করছেন রাজশাহীর গোদাগাড়ী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শিহাব উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘মামলাটা এখনও তদন্ত শুরু করতে পারিনি। মামলার বাদীকে ডেকেছি কথা বলার জন্য। তার কাছ থেকে বিষয়গুলো আরও ভালভাবে শুনব। রাজশাহীর রাজপাড়া থানায় এ ব্যাপারে আগে মামলা হয়েছে। তারা কীভাবে কি করছেন সেটিও খোঁজ নেব। তারপর তদন্ত কার্যক্রম এগিয়ে নেব।’

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

ইউএস অ্যাগ্রিমেন্ট অ্যাপের প্রতারণার মূলহোতা মাহাদি

আপডেট সময় : ০৯:৩৩:৩৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৪

স্টাফ রিপোর্টার: বিদেশী প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের নামে বিপুল টাকা হাতিয়ে নেওয়া অ্যাপ ইউএস অ্যাগ্রিমেন্টের নাটের গুরু মাহাদি ইসলাম (৩৩)। আগে তার নাম ছিল সজিব কুমার ভৌমিক। ২০১৮ সালে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর তিনি মাহাদি নাম ধারণ করেন। ২০১৪ সাল থেকেই একের পর এক অ্যাপ খুলে অনলাইনে তার প্রতারণা চলছে। সবশেষ ইউএস অ্যাগ্রিমেন্ট অ্যাপ প্রায় দুই হাজার মানুষের ৩০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাহাদির বাবার নাম মিন্টু কুমার ভৌমিক। বাড়ি নোয়াখালী সদর উপজেলার মাইজদী এলাকায়। এলাকায় কয়েকটি প্রতারণার মামলার আসামি হয়ে ২০১৭ সালের দিকে স্বপরিবারে চলে আসেন ঢাকায়। থাকতে শুরু করেন বনশ্রীর সি ব্লকের একটি বাসায়। ইউএস অ্যাগ্রিমেন্টের কেলেঙ্কারীর পর তিনি এখন লোকচক্ষুর আড়ালে। তবে এখনও ‘প্রো উইন ইএক্স’ নামে মাহাদীর একটি অ্যাপের কার্যক্রম চলছে। হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে টাকা।

ইউএস অ্যাগ্রিমেন্টের মাধ্যমে প্রতারণার অভিযোগে গত ১৭ জানুয়ারি রাজশাহীর রাজপাড়া থানায় একটি মামলা হয়। মামলায় পাঁচজনকে আসামি করা হয়। তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এ মামলায় অবশ্য মাহাদির নাম ছিল না। পরে ২৩ জানুয়ারি রাজশাহীর গোদাগাড়ী থানায় আরেকটি মামলা হয়। এ মামলায় আগের পাঁচজন ছাড়াও মাহাদিকে আসামি করা হয়।

প্রথম মামলার বাদী মোস্তাক হোসেন জানান, টাকা ফেরত না পেলে মামলা করবেন জানালে চতুর মাহাদিই তাকে সব তথ্য দিয়ে সহযোগিতার কথা বলেন। এ জন্য তাকে আসামি না করার অনুরোধ করেন। পরে তারা জেনেছেন, ওই মাহাদিই অ্যাপের পরিচালক। তাই পরে আরেক ভুক্তভোগীর মামলায় তাকে আসামি করা হয়েছে।

এই প্রতারণার বিষয়ে প্রথম মামলার পাঁচ আসামির মধ্যে তিনজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়েছে। হোয়াটসঅ্যাপে রাজশাহী বিভাগীয় প্রধান মো. ওয়াহেদুজ্জামান সোহাগ দাবি করেন, বিদেশী অ্যাপের কাজ জানিয়ে মাহাদি তার সঙ্গেই প্রতারণা করেছেন। গ্রাহকদের কাছ থেকে তিনি যে টাকা তুলেছেন তা হাতিয়ে নিয়েছেন মাহাদি। এখন সোহাগ ভারতে পালিয়ে আছেন।

সোহাগের স্ত্রী ও অ্যাপের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক হিসেবে আসামি হওয়া ফাতেমা তুজ জহুরা মিলি আদালতে হাজির হয়ে প্রথম মামলায় জামিন নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তার স্বামী অ্যাপটিকে বিদেশী প্রতিষ্ঠান জেনে চাকরি করতেন। তিনি কিছু জানেন না। আর কান্ট্রি ডিরেক্টর হিসেবে আসামি হওয়া মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের ফারুক হোসাইন সুজন দাবি করেন, তার কাছ থেকেই টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন মাহাদি। টাকা ফেরত না দিতে তাকেও আসামি হিসেবে ফাঁসিয়েছেন। ফারুক হোসাইন সুজন এ সংক্রান্ত কিছু কাগজপত্রও পাঠান।

ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, ২০১৪ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত সজিব কুমার ভৌমিক ওরফে মাহাদি নোয়াখালীতে ‘ট্রেড টুডে’ নামের একটি অ্যাপ চালাতেন। এই অ্যাপের মাধ্যমে নিজ এলাকার মানুষের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেন। এ নিয়ে তার বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলা হয়। তখন বাবা-মা ও ভাইকে সঙ্গে নিয়েই ঢাকায় পালিয়ে আসেন সজিব। তারা বনশ্রীর সি ব্লকের একটি বাসায় ভাড়া ওঠেন। প্রতারণা করে হাতিয়ে নেওয়া প্রচুর টাকা হাতে থাকায় তারা পুলিশ প্লাজার পাশে ‘ডক্টর মেডিসিন ফার্মা’ নামের একটি ওষুধের দোকান কিনে নেন। কিন্তু ফার্মেসি চালানোর মতো অভিজ্ঞতা তাদের ছিল না। তাই চন্দন নামে অন্য একটি দোকানের কর্মচারীকে বেশি বেতন দিয়ে নিজেদের দোকানে লাগান।

অভিযোগ আছে, এই দোকান দেখিয়ে আশপাশের লোকজনের কাছ থেকে প্রচুর টাকা হাতিয়ে নেন সজিবের বাবা মিন্টু কুমার ভৌমিক। আর সজিব ওরফে মাহাদি ‘ফরেক্স মার্কেট ইউএস ডটকম’ নামে আরেকটি অ্যাপ খোলেন। এই অ্যাপের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন নোয়াখালীর এমদাদুল হক ও মুন্না নামের দুজন। এই অ্যাপের মাধ্যমে ময়মনসিংহ থেকে প্রচুর টাকা হাতিয়ে নেন মাহাদি। সেখানে এজেন্ট ছিলেন মানিক মিয়া। এই অ্যাপের প্রতারণা বুঝতে পেরে ২০২২ সালে মাহাদির বিরুদ্ধে ময়মনসিংহে মামলা হয়। ২০২৩ সালের শুরুর দিকে মাহাদি ও তার পরিবার বনশ্রীর ভাড়া বাসা ও নিজেদের দোকান ফেলে পালিয়ে যান।

বিদেশী অ্যাপে বিনিয়োগের কথা বললেও মাহাদি তার এজেন্টদের কাছ থেকে গ্রাহকের টাকা নিতেন নিজের, বাবার কিংবা ভাইয়ের ব্যাংক হিসাবে। ডাচ বাংলা ব্যাংকে সজিব কুমার ভৌমিক নামে তার নিজের হিসাব নম্বর হলো- ১৬৪১৫৭০০২৬১০৬, বাবা মিন্টু ভৌমিকের নামে হিসাব নম্বর- ৩০৩১৫৭০০০৭১৭৩ ও ভাই রাজীব দেবনাথের নামে হিসাব নম্বর- ৩০৩১৫৭০০০৭১৬৮। ২০২১ সালের একটি ব্যাংক স্টেটমেন্টেই সজিব কুমার ভৌমিকের ব্যক্তিগত হিসাবে ৭১ লাখ ৩৭ হাজার ৫১৮ টাকা লেনদেনের চিত্র দেখা গেছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, নোয়াখালীতে এমএলএম অ্যাপ ট্রেড টুডের মাধ্যমে প্রতারণায় সজিব ওরফে মাহাদির প্রধান সহযোগী ছিলেন জাহাঙ্গীর আলম নামের এক ব্যক্তি। নোয়াখালীতে সজিবের নামে যে মামলা হয় তাতে জাহাঙ্গীরও আসামি হন। পরে তারা দুজনে একসঙ্গেই ঢাকায় পালিয়ে আসেন। পরবর্তীতে জাহাঙ্গীরের স্ত্রী পলি খাতুনের সঙ্গে মাহাদির পরকীয়া প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ২০১৯ সালে বিষয়টি বুঝতে পেরে জাহাঙ্গীর তার স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দুবাই চলে যান। পরের বছর পলিকে বিয়ে করেন মাহাদি। এখন পলিকে নিয়েই আত্মগোপনে তিনি। জাহাঙ্গীর আলম এখনও দুবাইতেই আছেন।

সূত্র বলেছে, সবশেষ ঢাকার সিরাজ মিয়া আর চট্টগ্রামের মোস্তাকিম মিয়া নামের দুজনকে নিয়ে ইউএস অ্যাগ্রিমেন্টের প্রতারণার জাল বিছান মাহাদি। পরে সিরাজকেও দূরে সরিয়ে দেন। এখন শুধু চট্টগ্রামের মোস্তাকিমকে নিয়ে চলছেন। প্রতারণা করে হাতিয়ে নেওয়া বিপুল টাকায় তারা আয়েশী জীবন কাটাচ্ছেন। তারা নিজেরা বাঁচতে ফাঁসিয়ে দিচ্ছেন অনেককেই।

রাজশাহীতে মামলার আসামি হওয়া ফারুক হোসাইন সুজন বলেছেন, সজিব তার প্রথম অ্যাপ ট্রেড টুডের মার্কেটিং করতে শ্রীমঙ্গলে গিয়েছিলেন। প্রলোভনে পড়ে তার এলাকার ছোট ভাই শাহ আলম ৬০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে ফেলেন। তখন টাকা উদ্ধারের জন্য তিনি সজিবের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সজিব তাকে ঢাকায় ডেকে ৪০ হাজার টাকা ফেরত দেন। এরপর সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন। প্রতারণার সময় মানুষের বিশ^াস অর্জনের জন্য সজিব ইসলাম ধর্ম গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। ২০১৮ সালে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। সুজন তার এক আইনজীবী বন্ধুর মাধ্যমে এফিডেফিট করিয়ে দেন।

সজিব ইসলাম গ্রহণ করে নিজের নাম রাখেন মাহাদি ইসলাম। ধর্মান্তরিত হওয়ার কারণে সুজনও তাকে বিশ^াস করতে শুরু করেন। পরে তার কথায় ইউএস অ্যাগ্রিমেন্টে বিনিয়োগ করেন ২০ লাখ টাকা। আত্মীয়-স্বজনকে বিনিয়োগ করান আরও প্রায় ৮০ লাখ টাকা। এই অ্যাপের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য স্ট্যাম্পে চুক্তি করে সুজনের দুটি গাড়িও ভাড়া নেন মাহাদি। তিনি একটি গাড়ি দিয়েছিলেন রাজশাহী বিভাগীয় প্রধান ওয়াহেদুজ্জামান সোহাগকে। সুজন শ্রীমঙ্গলের নিজের ল্যাপটপ ও মোবাইলের দোকান গুটিয়ে টাকা দিয়েছিলেন মাহাদিকে।

সুজন বলেন, একপর্যায়ে তিনি প্রতারণা বুঝতে পারলে টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য মাহাদিকে চাপ দেন। তখন মাহাদি তাকে ৯ লাখ, ৫ লাখ ও ৫ লাখ টাকার তিনটি চেক দেন। মাহাদি ওরফে সজিবের ডাচ বাংলা ব্যাংকে এই হিসাবের নাম ‘এম এইচ ট্রেডার্স’। হিসাব নম্বর- ৩০৩১১০০০০২১৪৪। সুজন পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, ময়মনসিংহের অর্থ কেলেঙ্কারীর পর পুলিশের অনুরোধে এই হিসাব অকার্যকর রেখেছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। তিনি টাকা তুলতে পারেননি।

সুজন বলেন, আমের মৌসুমে বেড়ানোর উদ্দেশ্যে তিনি মাহাদির সঙ্গে একবার রাজশাহী এসেছিলেন। তখন অ্যাপের কয়েকজনের সঙ্গে তার দেখা হয়। আর এ জন্যই তাকে অ্যাপের গুরুত্বপূর্ণ লোক দেখিয়ে মাহাদিই মামলা করিয়েছেন নিজে বাঁচতে এবং পাওনা টাকা না দিতে। এই মামলা হওয়ার পর তিনিও ফেরারি হয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে সজিব কুমার ভৌমিক ওরফে মাহাদি ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তার বাবা মিন্টু কুমার ভৌমিকের মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়া গেছে। তবে সংযোগ পাওয়া গেছে ভাই রাজীব কুমার ভৌমিক ওরফে রাজীব দেবনাথের মোবাইলে। রাজীব বলেন, তিনি এসবের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। এখন বিপর্যস্ত অবস্থায় আছেন। এ সময় তিনি কাঁদতে শুরু করেন এবং ফোনটি কেটে দেন। পরে আবার ফোন করা হলে তিনি ধরেননি।

মাহাদির বিরুদ্ধে হওয়া মামলাটির তদন্ত করছেন রাজশাহীর গোদাগাড়ী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শিহাব উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘মামলাটা এখনও তদন্ত শুরু করতে পারিনি। মামলার বাদীকে ডেকেছি কথা বলার জন্য। তার কাছ থেকে বিষয়গুলো আরও ভালভাবে শুনব। রাজশাহীর রাজপাড়া থানায় এ ব্যাপারে আগে মামলা হয়েছে। তারা কীভাবে কি করছেন সেটিও খোঁজ নেব। তারপর তদন্ত কার্যক্রম এগিয়ে নেব।’