শিবগঞ্জে চেয়ারম্যানের নির্দেশে বর্বরতা

23

স্টাফ রিপোর্টার, চাপাইনবাবগঞ্জ : চেয়ারম্যান ফয়েজ উদ্দীন আম ব্যবসায়ী রম্নবেল আলীর (২৮) দুই হাত কাটার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তার ক্যাডাররা রম্নবেলের দুই হাত কবজি থেকে কেটে ফেলেছেন। বুধবার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার উজিরপুর গ্রামে বর্বর এই ঘটনা ঘটেছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুলিশ সুপার (এসপি) টিএম মোজাহিদুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পরে চেয়ারম্যান ফয়েজ উদ্দীন নওগাঁ পালিয়ে যাচ্ছিলেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমনুরা এলাকায় তাকে পুলিশ আটক করেছে। চেকপোস্ট বসিয়ে পুলিশ একটি অটোরিকশা থেকে তাকে আটক করে। এরপর তাকে শিবগঞ্জ থানায় নিয়ে যাওয়া হয় বলেও জানান এসপি।
এ ঘটনায় চেয়ারম্যান ছাড়াও আরও তিনজনকে আটক করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃতরা হলেন- মূল আসামি উজিরপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফয়েজ আহমদ (৩৫), সহযোগী তারেক আহমদ (৩৫), জাহাঙ্গীর আলম (৩৫) ও আলাউদ্দিন (৩৫)। পুলিশ সুপার আরও জানান, রুবেলের উপর হামলার পর থেকেই পুলিশ বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাচ্ছিল আসামিদের ধরতে। এ ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন আছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
গতকাল ভোররাতে হাত হারানো রম্নবেলকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তিনি এখন হাসপাতালের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন। রুবেল শিবগঞ্জ উপজেলার নয়ালাভাঙ্গা গ্রামের খোদা বক্সের ছেলে।
দুই হাতের কব্জি হারানো রুবেল জানান, শিবগঞ্জের উজিরপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা ফয়েজ উদ্দিনের সাথে নদীর ঘাট নিয়ে তার দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এর জের ধরে তাকে চোখ বেঁধে তুলে নিয়ে গিয়ে দুই হাতের কব্জি কেটে দিয়েছে। পরে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়া হয়।
রুবেলের চাচাতো ভাই ও আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুস সালাম বলেন, বুধবার রাতে রুবেল তার দুই বন্ধুকে নিয়ে মোটরসাইকেলে করে বাড়ি আসছিলেন। এ সময় শিবগঞ্জের উজিরপুর বেড়ি বাঁধের কাছে কয়েকজন তাদের পথ রোধ করেন এবং পাশেই চেয়ারম্যান ফয়েজের চেম্বারে গিয়ে দেখা করতে বলেন। রুবেল বন্ধুদের নিয়ে চেম্বারে গেলে, তার দুই বন্ধুকে সেখানে আটকে রাখা হয়। আর রুবেলের মুখ ও চোখ গামছা দিয়ে বেঁধে পদ্মা নদীর বাঁধের নিচে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে নির্যাতন করে তার দুই হাতের কব্জি কেটে নেন চেয়ারম্যানের লোকজন। রাত ১টার দিকে খবর পেয়ে স্বজনরা গিয়ে তাকে উদ্ধার করে প্রথমে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাকে রামেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

আব্দুস সালাম আরো জানান, নিউ পদ্মা ফেরি ঘাট নিয়ে চেয়ারম্যান ফয়েজের সঙ্গে তাদের বিরোধ রয়েছে। এমপি ও তার ভাইয়ের মধ্যস্থতায় উভয় পক্ষ মিলে মিশে ঘাটটি চালাচ্ছিল। কিন্তু কিছু দিন ধরে ফয়েজ ফেরি ঘাটটি পুরো নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে চাচ্ছিলেন। এর জের ধরেই তার লোকজন রুবেলের দুই হাতের কব্জি কেটে নিয়েছেন। রুবেলের চিকিৎসা শেষে শিবগঞ্জ থানায় এ বিষয়ে মামলা করা হবে।
স্থানীয়রা জানান, চেয়ারম্যান ফয়েজ উদ্দীন সন্ত্রাসী প্রকৃতির লোক। তিনি ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত। যখন যে দল ড়্গমতায় আসে তখন সে দলের নেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন। ২০১৭ সালে তার ইউপির ৯ জন সদস্য উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন যে, চেয়ারম্যান তাদের গুলি করে হত্যার হুমকি দিয়েছেন। এলাকার এক আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের একটি মামলায় এ বছরের মার্চে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠিয়েছিল। রম্নবেলের হাত কেটে ফেলার বিষয়ে কথা বলতে আটক হওয়ার আগে একাধিকবার ফোন করা হলেও চেয়ারম্যান ফয়েজ উদ্দীন ফোন ধরেননি। তাই তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ (শিবগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য ডা. সামিল উদ্দিন আহমেদ শিমুল বলেন, রাতেই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের এক নেতা আমাকে ফোন করে জানান যে তিনজনকে আটকে রাখা হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে আমি ফয়েজকে ফোন করে বলি, ওদের ছেড়ে দাও। তা না হলে তোমার খবর আছে। সে আমাকে বলে, দেখছি। এরপর আমি ঘুমিয়ে পড়ি। সকালে ঘুম থেকে উঠে ফেসবুকে দেখি, রম্নবেলের দুই হাত নেই। এটা নির্মম। এটা বর্বর। এমন ঘটনা মেনে নেওয়া যায় না।
শিবগঞ্জ থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদনত্ম) আতিকুল ইসলাম জানান, ঘটনার খবর শুনে গতকাল সকালে তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তবে কাটা হাত উদ্ধার করা যায়নি। আহত ব্যক্তির বরাত দিয়ে পরিবারের সদস্যরা তাকে জানিয়েছেন, ধরে নিয়ে যাওয়া থেকে হাত কাটা পর্যনত্ম অনত্মত ১৫ থেকে ২০ জন এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত। তারা কারা তা জানতে আটক চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। মামলা দায়েরের পর আটকদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হবে।

SHARE