ভূমি অধিগ্রহণের অচলাবস্থা কাটাইয়া উঠিতে হইবে

162

বাংলাদেশের অনেক উন্নয়ন প্রকল্প শেষপর্যন্ত ভূমি অধিগ্রহণের অচলাবস্থায় যথাসময়ে আলোর মুখ দেখে না। ইহা আমাদের যুগপত্ উন্নয়নের অন্যতম বড় প্রতিবন্ধক। যেমন- প্রায় তিন বত্সর আগে ২০১৫ সালের ১২ নভেম্বর বগুড়ায় দলীয় এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জেলার উন্নয়নে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠাসহ বড় ধরনের ৮টি প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেন। এইজন্য জেলা সদর হইতে প্রায় আট কিলোমিটার দক্ষিণে বগুড়া-নাটোর মহাসড়ক সংলগ্ন শাজাহানপুর উপজেলার আশেকপুর ইউনিয়নের পাঁচটি মৌজার ২৫১ একর জমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু যখন প্রস্তাবিত জমির মূল্য নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়, তখনই ভূমি মালিকদের পক্ষ হইতে উচ্চ আদালতে একের পর এক দায়ের করা হয় মামলা। ফলে আইনি জটিলতায় ভূমি অধিগ্রহণে স্থবিরতা দেখা দেয়। আর প্রকল্প বাস্তবায়নে দেখা দেয় অনিশ্চয়তা।

ভূমি অধিগ্রহণে সমস্যা দেখা দিবার বহুবিধ কারণ রহিয়াছে। যদি জমিটি নিষকণ্টক বা সরকারি খাস জমি হয়, তাহা হইলে অধিগ্রহণে তেমন একটা বেগ পাইতে হয় না। কিন্তু যদি জমি ব্যক্তি মালিকানাধীন হয়, তাহা হইলে নানা প্রক্রিয়া শেষ করিতে কালবিলম্ব হওয়া অস্বাভাবিক নহে। এখানে জমির মালিক একাধিক হইলে সমস্যা দেখা দেয় আরো বেশি। সবাইকে রাজি করাইতে দেরি হয়। অনেক সময় একই পরিবারের শরিকদের একজনের আপত্তির কারণে জমি অধিগ্রহণ করা কঠিন হইয়া পড়ে। এইক্ষেত্রে জনহিতকর প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাহারা যদি সবাইকে ঠিকসময়ে প্রকল্পের উপকারিতা ও ইহার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বুঝাইতে সক্ষম হন, তাহা হইলে প্রক্রিয়াটি সহজতর হইতে পারে। এই ব্যাপারে আগে হইতেই সম্মতি আদায় বা প্রস্তুতি গ্রহণের কাজটি তাহারা অনায়াসেই করিতে পারেন। দ্বিতীয়ত জমির মূল্য নির্ধারণ লইয়াই অধিকাংশ ক্ষেত্রে বড় ধরনের অন্তরায়ের সৃষ্টি হয়। ভূমি মালিকরা ১৯৮২ সালের হুকুম দখল আইনের পরিবর্তে ২০১৭ সালের ২১ সেপ্টেম্বর প্রণীত আইনে ক্ষতিপূরণ বা জমির মূল্য দাবি করেন। ১৯৮২ সালের আইন অনুযায়ী ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে মালিকদের জমির প্রকৃত মূল্যের দেড়গুণ অর্থ পরিশোধ করিবার নিয়ম রহিয়াছে। অন্যদিকে ২০১৭ সালের আইনে জমির ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা বলা হইয়াছে তিনগুণ । তাই বাড়তি মূল্য পাইতেই ভূমি মালিকরা আদালতের দ্বারস্থ হইয়া থাকেন।

অবশ্য যেইসব প্রকল্প গ্রহণের প্রক্রিয়া ২০১৭ সালের আগেই শুরু হইয়াছে, সেইক্ষেত্রে ১৯৮২ না ২০১৭ সালের আইন কার্যকর হইবে তাহা লইয়াও কথা উঠিয়াছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই ব্যাপারে আগের আইনটিকেই ভিত্তি হিসাবে ধরিতে ইচ্ছুক। কিন্তু নূতন আইনে তুলনামূলকভাবে ক্ষতিপূরণ বাবদ বেশি অর্থ পাওয়া যাইবে বিধায় ভূমি মালিকগণ তাহা মানিতে নারাজ। যেহেতু বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন, তাই এই বিষয়ে আমাদের কোনো বক্তব্য নাই। তবে আমরা চাই জনগণের উন্নয়নের স্বার্থে ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া দ্রুততর, সহজতর ও স্বচ্ছ হউক। ভূমির মালিকগণ যদি বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী ন্যায্যমূল্য পান এবং আইন সেইভাবেই তৈরি হয়, তাহা হইলে ইহা লইয়া তেমন কথা থাকিতে পারে না। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও প্রত্যন্ত গ্রাম-গঞ্জের জমির মূল্য নির্ধারণ এবং সেই অনুযায়ী জমি ক্রয়-বিক্রয় বাবদ সরকারি রাজস্ব আদায়ের বন্দোবস্ত আছে। তাহা অনুসরণ করিলেও এই সংকট তেমন একটা দেখা দিবার কথা নহে।

SHARE