নগরীতে স্কুলে স্কুলে ভোট উৎসব

172

স্টাফ রিপোর্টার : রাজশাহীতে বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে বৃহস্পতিবার স্কুলপর্যায়ে স্টুডেন্ট কেবিনেট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আনন্দঘন পরিবেশের মধ্য দিয়ে রাজশাহীর মাধ্যমিক স্তরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনুষ্ঠিত হচ্ছে স্টুডেন্ট কেবিনেট নির্বাচন। সকাল ৯টায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়। চলে দুপুর ২টা পর্যন্ত। পৃথক বুথ তৈরি করে ভোটগ্রহণ করেন প্রিজাইডিং কর্মকর্তারা। মহানগরের শহীদ নজমুল হক বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ভোটার সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী সুমাইয়া ইসলাম স্নিগ্ধা বলে, এ নির্বাচন নিয়ে এক সপ্তাহ থেকে প্রচার-প্রচারণা চলছিল। এ বয়সে ভোটার হতে পেরে তার ভীষণ ভালো লাগছে। সকাল ৯টাতেই ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে বলেও জানায় স্নিগ্ধা। জানতে চাইলে রাজশাহী জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন বলেন, রাজশাহী জেলায় ৫৩৭টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একযোগে স্টুডেন্ট কেবিনেট নির্বাচন হচ্ছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়। তিনি বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাজশাহীর শিরোইল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে গিয়ে এ নির্বাচন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন। শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট উৎসবে অংশ নিতে দেখা গেছে। ম্যানেজিং কমিটির সদস্য, অভিভাবক ও শিক্ষকরা নিজ নিজ স্কুলে উপস্থিত রয়েছেন। এ নির্বাচন অঙ্কুরেই শিক্ষার্থীদের গণতন্ত্রমনা করে গড়ে তুলবে বলেও এসময় মন্তব্য করেন নাসির উদ্দিন। এদিকে, নগরীর শিমুল মেমোরিয়াল নর্থ সাউথ স্কুলেও অনুষ্ঠিত হয়েছে স্টুডেন্ট কেবিনেট নির্বাচন ২০১৯। বৃহস্পতিবার সকাল ৯ টার দিকে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন স্কুলের ১০ম শ্রেণির ছাত্রী প্রধান নির্বাচন কমিশনার ফাবলিহা তাবাস্সুম রিদিতা। নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে মোট ১৩ প্রার্থী। এদের মধ্যে বিজয়ী প্রার্থীর সংখ্যা ৮। বিজয়ী প্রার্থীদের মধ্যে ২০৪ ভোট পেয়ে ১ম স্থান অধিকার করেছে ১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থী রাফসান ওয়ারিদ রিদম। তার নিকটবর্তী প্রার্থী ৭ম শ্রেণির হুমায়রা আখতার ১৮১ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে। ১৭২ ভোট পেয়ে ৮ম শ্রেণির মোহাইমিনুল ইসলাম মুনিম ৩য় স্থান, ১৬৪ ভোটে পেয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণির রাফসানা তাসনিম বিত্তা ৪র্থ স্থান, ১৫৯ ভোট পেয়ে ৯ম শ্রেণির খাজা আব্দুল্লাহ বিন জামান ৫ম স্থান, ১৫৬ ভোট পেয়ে ১০ম শ্রেণির নাফিসা তাসনিম পার্বনী ৬ষ্ঠ স্থান, ১৪৯ ভোট পেয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণির ফারহাতুল হাসান নয়ন ৭ম এবং ১৪৮ ভোট পেয়ে ৮ম শ্রেণির ইসরাত জাহান ঋতু ৮ম স্থানে বিজয়ী হয়েছে। নির্বাচনে ১০টি বুথে ভোট গ্রহণ করা হয়। ভোট গ্রহণ শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ফাবলিহা তাবাস্সুম রিদিতা ফলাফল ঘোষণা করেছেন। এসময় উপস্থিত ছিলেন, শিমুল মেমোরিয়াল নর্থ সাউথ স্কুলের সম্মানিত চেয়ারম্যান এম.এ মান্নান খান, নির্বাহী পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার নাজমা রহমান, প্রধান শিক্ষক নাহিদা আখতার, সহ প্রধান শিক্ষক কামনা রাণী এবং উপশহর ও উপর ভদ্রা শাখার শাখা প্রধান সহ সম্মানিত শিক্ষকম-লী। অপর দিকে, সকাল সাড়ে ৯টা। রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলে গিয়ে দেখা যায় ১০টি কক্ষের সামনে ইউনিফরম পড়া ছাত্রদের লম্বা লাইন। তারা ভোট প্রদানের জন্য লাইনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়েছেন। এক ছাত্রকে জিজ্ঞেস করতেই তিনি বললেন, তাদের স্টুডেন্ট কেবিনেট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তাই ভোট প্রদানের জন্য লম্বা লাইনে দাঁড়িয়েছে। একই চিত্র নগরীর মাধ্যমিক পর্যায়ের সব বিদ্যালয়ের। শুধু তাই না, জেলার ৫৩৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সব স্কুলেই সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত স্টুডেন্ট কেবিনেট নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বলা যায়, উৎসবমুখর পরিবেশে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে স্টুডেন্ট কেবিনেট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। শিক্ষার্থীদেরকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্ব স্ব স্কুলে উপস্থিত হয়ে ভোট প্রদান করতে দেখা গেছে। ভোট প্রদানের হারও সন্তোষজনক। এবছর একজন শিক্ষার্থী একটি ব্যালটে ৮ জন প্রার্থীকে ভোট প্রদান করেছে। একজন শিক্ষার্থী প্রতিটি ক্লাসের একজন করে প্রার্থীকে ভোট প্রদানের পাশাপাশি বাকি আরো তিনটি ভোট যেকোনো তিনটি শ্রেণির তিনজন প্রার্থীকে ভোট প্রদান করেছে। এদিকে ভোটপ্রদান শেষে ফলাফলও প্রকাশ করা হয়েছে। ভোট প্রাপ্তির উপর নির্ভর করে বিজয়ী প্রার্থীদের মাঝে স্ব স্ব দায়িত্ব এক সপ্তাহের মধ্যে বণ্টন করে দেয়া হবে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত তিনবছর ধরে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে স্টুডেন্ট কেবিনেট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই নির্বাচনের যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে শিক্ষার্থীরা নিজেই। এজন্য একজন শিক্ষার্থীকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব দিয়ে তার অধীনে দুইজন নির্বাচন কমিশনারকে ভোট গ্রহণের দায়িত্ব দেয়া হয়। এছাড়া শিক্ষার্থীরা নিজেই পোলিং অফিসার ও প্রিজাইডিং অফিসারের দায়িত্ব নিয়ে ভোটগ্রহণ করে। আর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য দায়িত্ব দেয়া হয় স্কুলের স্কাউট সদস্যদের। শিক্ষকরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে গণতান্ত্রিকতা, নেতৃত্বের মনোভাব ও শৃঙ্খলা তৈরিতে এই স্টুডেন্ট কেবিনেট নির্বাচন সহায়তা করবে।
রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের এক হাজার ৭০ জন শিক্ষার্থী তাদের প্রতিনিধি নির্বাচনের জন্য ভোট প্রদান করেন। এই স্কুল থেকে মোট ১৪ জন প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। নির্বাচন শেষে ৮ জনকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। এই স্কুল থেকে ভোট প্রদানের হারও সন্তোষজনক। এই স্কুল থেকে প্রভাতী শাখার ৫৫০ জন ভোটারের মধ্যে ভোট দিয়েছে ৪১৫ জন যা শতকরা হিসেবে ৭৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ এবং দিবা শাখার ৫২০ জন ভোটারের মধ্যে ভোট দিয়েছে ৪৪৮ জন যা শতকরা হিসেবে ৮৬ দশমিক ১৫ শতাংশ। ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র রাব্বী জানান, এই বছরই প্রথম ভোট দিলাম। সে হিসেবে অনেক ভালো লাগছে। যোগ্যতা দেখে ভোট প্রদান করেছি বলে জানান তিনি। সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী পড়শি বলেন, গতবারও ভোট দিয়েছিলাম। এইবারও ভোট দিলাম। ভোট দিতে পেরে খুব ভালো লাগছে। ১৮ বছরের নিচের বয়সে ভোট দেয়ার আনন্দই আলাদা। কলেজিয়েট স্কুলের প্রধান নির্বাচন কমিশনার শাওন বলেন, যারা যোগ্য প্রার্থী ছিলো তাদেরই মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। এছাড়া কীভাবে ভোট প্রদান করতে হবে সেই বিষয়েও শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ধারণা দেয়া হয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা শৃঙ্খলার সাথেই শান্তিপূর্ণভাবে ভোট প্রদান করেছে। পিএন সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে মোট এক হাজার ১১৯ জন শিক্ষার্থী তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। এই স্কুল থেকে দিবা ও প্রভাতী শাখা মিলে মোট ২২ জন শিক্ষার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নির্বাচন শেষে দুই শাখা মিলে ১৬ জন প্রার্থী বিজয়ী হন। ফলাফল গণনা শেষে পিএন স্কুলের প্রভাতী শাখায় সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে প্রথম স্থান অর্জন করেছে সাদিয়া রহমান। তিনি ১০ম শ্রেণির খ শাখার ছাত্রী। তিনি জানান, স্টুডেন্ট কেবিনেট নির্বাচিত হয়ে শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে কাজ করবো। একই কথা জানালেন দিবা শাখায় প্রথম স্থান অর্জন করা ১০ম শ্রেণির গ শাখার ছাত্রী ঐশ্বরিয়া ফৌজদার। তিনি ছাত্রীদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে কাজ করবেন। তবে নগরীর বি বি হিন্দু একাডেমি থেকে ৬০০ জন শিক্ষার্থী ভোটার হলেও এই স্কুলে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সংখ্যা ৩৮ জন। ভোট প্রদানের হারও আশানুরূপ নয়। এই স্কুল থেকে মাত্র ২০০ জন শিক্ষার্থী ভোটাধিকার প্রদান করেন। মেহেরচ-ী উচ্চ বিদ্যালয়ে বিপুল উৎসাহ ও উদ্দীপনায় স্টুডেন্টস কেবিনেট নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। বিদ্যালয়ের মোট ৮ পদের বিপরীতে ৯ জন শিক্ষার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এর মধ্যে ছাত্র-২ ও ছাত্রী ৭ জন প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। মোট ভোটার ছিল ২৬৭, ভোটাধিকার প্রয়োগ করে ১৮৩ জন। গত বছরের ছাত্র প্রতিনিধি ৮ম শ্রেণির খাদিজা আক্তার শাম্মী ১৬১ ভোট পেয়ে প্রথম হয়েছে। ১০ম শ্রেণির সুরাইয়া খাতুন ১৪৭ ভোট পেয়ে ২য় স্থান এবং ৭ম শ্রেণির ফারহানা আক্তার ঐশী ১৪২ ভোট পেয়ে ৩য় স্থানে পুনরায় নির্বাচিত হয়েছে। অন্য ছয়জন নির্বাচিত প্রতিনিধি যথাক্রমে ৬ষ্ঠ শ্রেণির মহুয়া আক্তার মিলি ও রওশন আরা পারভীন, ৭ম শ্রেণির আসিফ আহম্মেদ, ৯ম শ্রেণির বিজয় ও মাহফুজা খাতুন।
প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন দশম শ্রেণির ছাত্র জিহাদুল ইসলাম। এছাড়া ২ জন সহকারী কমিশনার, প্রিজাইডিং অফিসার একজন ও পোলিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করেন ৪ জন ছাত্র-ছাত্রী। রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের প্রধান শিক্ষক ড. নূরজাহান বেগম জানান, শিক্ষার্থীদের মধ্যে মূল্যবোধ, গণতান্ত্রিক অধিকার ও শৃঙ্খলা, নিয়মানুবর্তিতা ও নেতৃত্ব তৈরিতে স্টুডেন্ট কেবিনেটের নির্বাচন সহায়তা করবে। এইখান থেকেই আগামি দিনের নতুন নেতৃত্ব তৈরি করবে।

SHARE