প্রশাসনের অবহেলায় খ্যাতি নষ্ট হচ্ছে খেজুরের গুড়ের

177

বাঘা প্রতিনিধি : এক সময় ছিল শীত মৌসুমে রাজশাহীর বাঘা উপজেলা সদরে (খেজুর গুড়) হাটের মধ্যে প্রবেশ করলে গুড়ের সুগন্ধি (ঘ্রাণ) পাওয়া যেতো। কিন্তু এখন সেই সুগন্ধি আর পাওয়া যায় না। কারণ বাজারে চিনির চেয়ে গুড়ের দাম অধিক হওয়ায় কতিপয় কৃষক ও মোনাফালোভীরা গুড়ের সাথে চিনি মেশাচ্ছে। এর ফলে বাঘা অঞ্চলে খেজুর গুড়ের যে খ্যাতি সেটা হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ এ বিষয়ে সরকারী ভাবে কোন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না। সুত্র মতে, বাঘায় আমের পরে খেজুরের গুড়ের স্থান। বর্তমান শীত মৌসুমে প্রায় ৮ কোটি টাকার খেজুরের গুড় বিক্রির লক্ষ্য নিয়ে উৎপাদন শুরু করেছেন এ অঞ্চলের কৃষকরা। দেশ বিখ্যাত বাঘার খেজুরের গুড় ইতোমধ্যে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাওয়া শুরু হয়েছে। তাই কৃষকরা ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন খেজুরের রস থেকে গুড় তৈরীতে। বাঘায় খেজুরের গুড়ের বাণিজ্যিক উৎপাদনকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, বাঘায় খেজুরের গুড়ের বাণিজ্যিক উৎপাদন এ অঞ্চলের আর্থ সামাজিক উন্নয়নে বিরাট ভুমিকা পালন করবে। সেই সাথে দারিদ্রতা ঘুচাতেও ব্যাপক সহায়তা করবে। উপজেলা কৃষি বিভাগ সুত্রে জানা গেছে , এ উপজেলার ২টি পৌরসভা ও ৭ টি ইউনিয়নে প্রায় ৩০ হাজার কৃষি পরিবার রয়েছে। যাদের প্রত্যেকেরই কমবেশি খেজুর গাছ রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৩ হাজার খেজুর বাগান রয়েছে। এ ছাড়া সড়কপথ, রেললাইনের ধার, পতিত জমি, জমির আইল ও বাড়ির আঙিনায় মিলে প্রায় লক্ষাধিক খেজুর গাছ রয়েছে। একজন ব্যক্তি প্রতিদিন ৪০-৫০টি খেজুর গাছের রস আহরণ করতে পারে। এ রকম ৪-৫ হাজার ব্যক্তি রয়েছে যারা শীত মৌসুমে খেজুরের রস সংগ্রহ করতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। যারা খেজুর গাছ লাগায় তাদের আঞ্চলিক ভাষায় গাছি বলা হয়। মৌসুমভিত্তিক এ পরিবারগুলো খেজুর গাছের ওপর নির্ভরশীল। একজন গাছি এক মৌসুমে অর্থাৎ ১২০ দিনে ১টি গাছ থেকে ২০ থেকে ২৫ কেজি গুড় পেয়ে থাকেন। খেজুর গাছ ফসলের কোনো ক্ষতি করে না। এ গাছের জন্য বাড়তি কোনো খরচও করতে হয় না। ঝোপ-জঙ্গলে কোনো যত্ন ছাড়াই বড় হয়ে ওঠে খেজুর গাছ। শুধু মৌসুম এলেই নিয়মিত গাছ পরিষ্কার করে রস সংগ্রহ করা হয়। এরপর সেই রস দিয়ে তৈরী করা হয় সুস্বাদু গুড়। স্থানীয় লোকজন জানান, কিছু অসাধু কৃষকের কারণে এ অঞ্চলে খেজুর গুড়ের যে খ্যাতি ছিল সেটা দিনদিন হারিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান বাজারে চিনির চেয়ে গুড়ের মূল্য বেশি হওয়ায় উপজেলায় চিনিসহ ফরমালিন মেশানো হচ্ছে। হায়ডজ, ফিটকারি, চুন ইত্যাদি ফরমালিন খেৎুর গুড়ের সাথে মিশ্রন করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার উপজেলা সদরে অবস্থিত বাঘা হাটে গিয়ে জানা যায়, বর্তমানে চিনির মূল্য ৪৬ থেকে ৪৮ টাকা কেজি। এ দিক থেকে খেজুর গুড় ৫২ থেকে ৫৫ টাকা কেজি। প্রতি কেজিতে ৬ থেকে ৭ টাকা অতিরিক্ত আয়। যার লোভ সামলাতে পারছে না গুড় তৈরীর সাথে সম্পৃক্তরা। বাঘার আমোদপুর গ্রামের হোসেন আলী গুড়ের সাথে চিনি মেশানোর সত্যতা স্বীকার করে বলেন, খেজুর গুড়ে চিনির মিশ্রনে রং এবং স্বাদের কোনই পরিবর্তন হচ্ছে না। বরং কোনকোন দিন শীত কম থাকলেও গুড় টিকসই হচ্ছে। এ কারণে তিনিসহ উপজেলার সকল কৃষকরা বর্তমানে গুড়ের সাথে চিনি মেশাচ্ছেন । তার মতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করলে তিনি কেন কেউই এ কাজ করতে সাহস পাবেন না। বাঘা স্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রধান (টিএইচএ) ডাক্তার সিরাজুল ইসলাম গুড়ের সাথে চিনিসহ অন্যান্য রাসায়নিক পদার্থ মেশানো প্রসঙ্গে বলেন, এটা মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক। এই সমস্ত মিশ্রনে শরীরে রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া হয়। তাঁর মতে, যারা এই সকল ভেজাল মেশাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহিন রেজা বলেন, বাঘায় খেজুরগুড়ে চিনি মেশানো হচ্ছে এমনটি অভিযোগ লোকমুখে শুনেছি। খুব শিগ্রই এ বিষয় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

SHARE