বিয়ে রেজিস্ট্রশনে প্রযুক্তির ব্যবহারে বাল্যবিয়ে বন্ধ করা সম্ভব

162

জিল্লুর রহমান : আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্টসহ প্রয়োজনীয় যাবতীয় কাজ সম্পন্ন হলেও প্রযুক্তির ব্যবহার থেকে পিছিয়ে পড়েছেন কাজীরা। বিয়ে রেজিস্টারের কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য ভা-ার বা তথ্য সার্ভার না থাকায় জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাইয়ে প্রযুক্তিগত কোনো ব্যবস্থা না থাকায় যাচাই-বাছাই করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের অজান্তেই বাল্যবিয়ে পড়াতে বাধ্য হচ্ছেন।
দেশের প্রচলিত আইন মোতাবেক বিবাহকার্য পরিচালনার জন্য মুসলিম বিবাহ রেজিস্ট্রারের জন্য আলিম পাশ এবং হিন্দু বিবাহ রেজিস্ট্রারের জন্য গ্র্যাজুয়েট যোগ্যতাসম্পন্নদের আবেদনের প্রেক্ষিতে পৃথকভাবে নিকাহ রেজিস্ট্রার নিয়োগ দেয়া হয়। কিন্তু প্রযুক্তিগত বিষয়ে তাদের দক্ষতা, প্রশিক্ষণ বা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা নাইÑ নিয়োগপত্রেও এ সম্পর্কিত কোনো নির্দেশনা থাকে না।
এ বিষয়ে জানতে ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের কাজী মোহাম্মদ আলীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বিয়ে পড়ানোর সময় বর ও কনের পরিবার তাদের জন্মনিবন্ধন যা এলাকার চেয়ারম্যান, মেম্বার বা কাউন্সিলরের স্বাক্ষরিত বা জন্মনিবন্ধনের এফিডেভিড কপি দেখায়। কিন্তু তা সঠিক কিনা তা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করার কোনো সুযোগ নাই। তাই পরিবারের অভিভাবকদের কথার উপর বিশ্বাস করেই আমাদের নিকাহ রেজিস্ট্রি করতে হয়। তিনি আরো জানান, অনেক ক্ষেত্রে দু এক জায়গায় কিছু অসাধু লোক (ইমাম) অর্থের বিনিময়ে বর বা কনে প্রাপ্তবয়স্ক যাচাই না করেই বিয়ে পড়িয়ে দেয়। কিন্তু আমরা যারা বাল্যবিয়ের বিপক্ষে তারা ভোগান্তির শিকার হচ্ছি। সরকার যদি জন্মনিবন্ধন সঠিক কিনা তা প্রযুক্তির মাধ্যমে পরীক্ষা বা যাচাই করে দেখার ব্যবস্থা করে দিত এবং কাজীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে বাল্য বিয়ে প্রতিরোধ সম্ভব হয়।
১২ নম্বর ওয়ার্ডের কাজী মো. হাকিম জানান, অভিভাবকদের অসচেতনতা বাল্যবিয়ের অন্যতম কারণ এবং প্রযুক্তির অপব্যবহারের কারণে স্কুল শিক্ষার্থীরাও প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও সন্তানদের চাপের কারণে বিয়ে পড়িয়ে দিতে হচ্ছে। আবার সামাজিক অনিরাপত্তার কথাও চিন্তা করে অভিভাবকরা এরকম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে। তিনি আরো জানান, ২০১৫ সালে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে এফিডেভিডকৃত বিয়ে এবং তালাক বিষয়ে অবৈধ ঘোষণা করে সরকার কর্তৃক একটি গেজেট প্রকাশ হয়। এরপর থেকে এসব অবৈধ বিয়ের সংখ্যা প্রায় নেই বলেলই চলে। তিনি আরো বলেন, বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা কর্তৃক সচেতনতামূলক সভার মাধ্যমে অভিভাবক এবং সমাজের ইমামদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো সম্ভব হলে এটি মোকাবিলা করা সম্ভব। সচেতন হলে এবং সমাজ সচেতন হলে সম্পূর্ণ ভাবে বাল্যবিয়ে বন্ধ করা সম্ভব।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কাজী জানান, অনেক সময় আমাদেরকে এধরনের কাজ করতে হয়। যেহেতু আইনত বাল্যবিয়ে নিষিদ্ধ এবং অবৈধ কিন্তু সামাজিক নিরাপত্তার অভাব, পরিবারের অর্থনৈতিক সমস্যা, কুসংস্কার এবং সন্তানদের অনাকাক্সিক্ষত সম্পর্কের কারণে অভিভাবকদের কথায় গোপনে বিয়ে পড়িয়ে দিতে হচ্ছে কোনো রেজিস্ট্রি ছাড়াই। তবে এটি বন্ধ হওয়া প্রয়োজন, কারণ বিয়ে পরবর্তী কোনো সমস্যা সৃষ্টি হলে কোনো উপায় না পেয়ে আরো ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে বিশেষ করে মেয়েদের এবং সেই সাথে তাদের পরিবারকেও।
এ বিষয়ে অ্যাড. দিল সেতারা চুনি বলেন, সামাজিক নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে অভিভাবকরা মনে করেন বিয়ে দিলে মেয়েটা নিরাপদ থাকবে। এছাড়া অভিভাবকদের অজ্ঞতা, দরিদ্রতাই মূল কারণ। নি¤œবিত্ত পরিবারের মধ্যে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। যৌতুকও অন্যতম একটি বড় কারণ। অল্প বয়সে কম যৌতুকেই মেয়েদের বিয়ে দেওয়া যায় বলে নি¤œবিত্ত পরিবার বাল্যবিয়ে দিচ্ছেন। তিনি জানান, এসব বিয়ে রেজিস্ট্রি ছাড়াই পড়ায় কাজীরা। প্রাপ্তবয়স্ক না হলে বিয়ে রেজিস্ট্রি হবে না বলে অভিভাবকদেরকেও কোনো কাগজ দিতে পারে না। প্রাপ্তবয়স্ক হলেই তারপর কাবিননামা দেয় এবং ততদিন পর্যন্ত রেজিস্ট্রি কাগজ গোপন রাখে। এসব ক্ষেত্রে চেয়ারম্যান মেম্বাররাদের অবগত করেই অভিভাবকরা বাল্যবিয়ে দিয়ে থাকেন। তিনি জানান, এখানেও আইনত কিছু জটিলতা আছে যে, এই বিষয়ে বিয়ে পরবর্তী কোনো সমস্যা হলে যারা জনপ্রতিনিধি তারাই কিন্তু মামলা করতে পারবে। ভুক্তভোগি, ক্ষতিগ্রস্ত বা সাধারণ কোনো ব্যক্তি এ বিষয়ে সরাসরি মামলা করতে পারে না। তিনি বলেন, এই ক্ষেত্রে আইনের সংশোধন প্রয়োজন, সামাজিক নিরাপত্তা আরো জোরদার করা দরকার। সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে এবং যেসব কাজীরা এসব করছেন তাদের চিহ্নিত করে তাদের শাস্তির আওতায় নিয়ে আসতে পারলে এবং শুধু কাজী না এসব বিয়ের ক্ষেত্রে যারা জড়িত সবাকেই আইনের আওতায় নিয়ে আসতে পারলে এটি নির্মূল করা সম্ভব হবে।

SHARE