বাংলাদেশের বিশ্ব জয়

24

অনলাইন ডেস্ক : লো-স্কোরিং ম্যাচ, তারপরও হাজারোবার বদলাল ম্যাচের রং। তার ওপর পরিসংখ্যান, সাম্প্রতিক ইতিহাস, অভিজ্ঞতা কিংবা শক্তিমত্তা—কোনোটাই বাংলাদেশ দলের পক্ষে ছিল না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবকিছুকে বুড়ো আঙুল দেখাতে পারল আকবর আলীর দল। ছোটোদের বিশ্বকাপের নতুন চ্যাম্পিয়ন এখন বাংলাদেশ দল।

যে ভারতীয় অনূর্ধ্ব ১৯ দল চারবার বিশ্বকাপ জয় করেছে, তাদের গতকাল রোববার বেঁধে রাখা গিয়েছিল মাত্র ১৭৭ রানে। জবাবে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে ৩ উইকেটের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব ১৯ দল। প্রথমবারের মতো আইসিসির যেকোনো ইভেন্টের ট্রফি হাতে তুলে নেন বাংলাদেশের অধিনায়ক।

পচেফস্ট্রুমের সেনওয়েস পার্কে ১৭৮ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে বাংলাদেশের শুরুটা ছিল স্বপ্নের মতো। দুই ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম ও পারভেজ হোসেন ইমন মিলে তুলে ফেলেছিলেন ৫০ রান।

সেখান থেকে ম্যাচের গতিপথ যেভাবে নির্ধারিত হওয়ার কথা ছিল, তা হয়নি। কারণ ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) দল কিংস ইলেভেন পাঞ্জাবে এবারই নিলামের মধ্য দিয়ে নাম লেখানো লেগ স্পিনার রবি বিষ্ণয় এদিন হয়ে উঠেছিলেন অতিমানব। শুরুটা হয় তামিমকে দিয়ে। বিষ্ণয়ের প্রথম ওভারেই ছক্কা হাঁকানো তামিম আবারও একই শট খেলতে গিয়ে জশস্বী জসওয়ালের হাতে ক্যাচ দেন মিড উইকেটে।

৫০ রানে প্রথম উইকেট হারানো বাংলাদেশ ৬৫ রানের মধ্যে ৪টি উইকেট হারিয়ে ফেলে। এর ওপর আরেক ওপেনার ইমন মাসল ক্র্যাম্প নিয়ে বাধ্য হন সাজঘরে ফিরতে।

এমন অবস্থায় দলের হাল ধরেন অধিনায়ক আকবর আলী। একপ্রান্ত আগলে রেখে তিনি একটু একটু করে এগিয়ে নিয়ে যান দলের ইনিংস। তবে যোগ্য সঙ্গী পেয়েছেন কমই। ৭ রান করে শামীম হোসেন ও ৫ রান করে অভিষেক দাস ফিরে যান সাজঘরে।

ড্রেসিংরুম থেকে শুশ্রুষা নিয়ে ফিরে আসেন ইমন। বাংলাদেশ দল তখন অকূল পাথারে। ১০২ রান তুলতেই ছয় জন ব্যাটসম্যান ফিরে গেছেন সাজঘরে। আকবরকে সঙ্গে নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন ইমন। দুজন মিলে সপ্তম উইকেট জুটিতে যোগ করেন ৪১ রান। পার্টটাইম লেগ স্পিনার জসওয়ালের বলে তিনি সাজঘরে ফেরেন। আউট হওয়ার আগে করেন ৪৭ রান।

এরপর রাকিবুল হাসানের সঙ্গে ২০ রানের জুটি গড়ার পরই নামে বৃষ্টি। বাংলাদেশের স্কোর তখন ৭ উইকেটে ১৬৩। হাতে ছিল আরো ৯ ওভার। জয় থেকে তখন মাত্র ১৫ রান দূরে বাংলাদেশ। মিনিট বিশেক বাদে আবারও খেলা মাঠে গড়ায়। আবারও খেলা শুরু হয়। বাংলাদেশের নতুন লক্ষ্য দাঁড়ায় ৩০ বলে ৭ রানের। প্রথম ওভারেই ৬ রান নিয়ে ভারতের সমতায় চলে আসে দল।

এরপর অপেক্ষা কেবল ১ রানের। কোনো ভুল করলেন না রাকিবুল। অথর্ব আনকোলেকারের ফ্লাইটেড ডেলিভারিতে মিড উইকেটে তুলে মেরেই পূর্ণ হলো ১ রান। ব্যস, হয়ে গেল বাংলাদেশের বিশ্বজয়, ২৩ বল বাকি থাকতেই। ৪৩ রানের অপরাজিত এক ইনিংস খেলে জয়ে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন অধিনায়ক আকবর।

বাউন্ডারির বাইরে অপেক্ষমাণ খেলোয়াড়েরা পতাকা নিয়ে চলে এলেন মাঠে। শুরু হলো উল্লাস। পচেফস্ট্রুমের মাঠে তখন এক টুকরো বাংলাদেশ। বিশ্বজয়ের আনন্দ এমনই হয়!

টসে জিতে আকবর আলীর বোলিং নেওয়ার সিদ্ধান্তটা চমকপ্রদ ছিল। যদিও নিজেদের পরিকল্পনায় বোলিংয়ে চূড়ান্ত সফল ছিল বাংলাদেশ। দুই পেসার শরিফুল ইসলাম ও তানজিম হাসান সাকিবের আগুনঝরা বোলিংয়ে ভারতের স্কোর বোর্ড এগোচ্ছিল কচ্ছপ গতিতে।

যদিও প্রথম আঘাত হানেন আরেক পেসার অভিষেক দাস। টুর্নামেন্টে প্রথমবারের মতো খেলতে নামা বাংলাদেশের এই ‘সারপ্রাইজ প্যাকেজ’ ৯ রানের মাথায় দিব্যানিশ সাক্সেনাকে ফেরান সাজঘরে। এরপর অবশ্য আরেক ওপেনার জশস্বী জসওয়াল তিলক ভার্মাকে সঙ্গে নিয়ে ৯৪ রানের বড়ো জুটি গড়েন। এরপর ব্যক্তিগত ৩৮ রানের মাথায় সাকিবের বলে শরিফুলের হাতে ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফেরেন তিলক। ভারতের ইনিংসের তখন ২৯তম ওভারের খেলা শেষ।

এরপর অধিনায়ক প্রিয়াম গার্গ খুব বেশিক্ষণ উইকেটে টিকতে পারেননি। ৭ রান করেই রাকিবুল হাসানের বলে সাকিবের হাতে ক্যাচ তুলে দিয়ে বিদায় হয় তার। তবে তখনো বাংলাদেশের গলার কাঁটা হয়ে উইকেটে টিকে ছিলেন জসওয়াল।

দলীয় ১৫৬ রানের মাথায় তিনিও চলে যান। শরিফুলের করা ৪০তম ওভারের পঞ্চম বলে পুল করতে গিয়ে মিডঅনে তানজিদ হাসান তামিমের হাতে ক্যাচ তুলে দেন এই বাঁ-হাতি ওপেনার। যদিও এর আগেই ১২১ বল খেলে ৮৮ রান করে ফেলেন তিনি। ইনিংসে ছিল ৮টি চার ও ১টি ছক্কা।

জসওয়ালের বিদায়ের পরই ভারতের ব্যাটিংয়ের চূড়ান্ত পতন শুরু হয়। ভারত মাত্র ২৩ রানের মধ্যে নিজেদের শেষ ৭টি উইকেট হারায়। ৪৭.২ ওভারে অলআউট হওয়ার আগে দলটি করে মাত্র ১৭৭ রান।

বোলারদের মধ্যে সবচেয়ে সফল ছিলেন শরিফুল ও অভিষেক। অভিষেক দলের হয়ে ৩টি উইকেট নেন। তবে নিখুঁত লাইন-লেন্থ ধরে রেখে ভারতকে চাপে রাখেন শরিফুল। তিনি পান ২টি উইকেট। আরেক পেসার সাকিবের ঝুলিতেও যোগ হয় ২ উইকেট। আর বাঁ-হাতি স্পিনার রাকিবুল হাসান নেন ১টি উইকেট।

এরপর ব্যাটিংয়ে নামার পর অনেক পালাবদলের পর শেষ হাসি হাসল বাংলাদেশই। দেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যত্ প্রজন্ম রচনা করল নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের ইতিহাস!

SHARE