রাজশাহীতে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে চলছে পুকুর খনন

18

স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহীতে উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে কৃষিজমিতে চলছে পুকুর খনন। স্থানিয় প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ উপজেলা প্রশাসন ও থানা পুলিশকে ম্যানেজ করে পুকুর খনন করায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার বিঘা ফসলি জমি। পুকুরের কারনে কৃষি জমিতে জলাবদ্ধতায় অনাবাদি থাকছে হাজার হাজার বিঘা জমি। এ নিয়ে সাধারণ জনগণের মাঝে দেখা দিয়েছে অসন্তোষ। আর জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে প্রশাসনের অবস্থান নিয়ে।
জানা গেছে, পুলিশ প্রশাসনের নাকের ডোগা দিয়ে পুকুরখনন কাজে ব্যবহৃত মাটি বোঝাই অবৈধ ট্রাক্টর গ্রামীণ পাকা রাস্তার বারোটা বাজাচ্ছে। আবার উপজেলা প্রশাসন থেকে দিনে অভিযান চালিয়ে যে পুকুর খনন বন্ধ করা হচ্ছে, রাতেই আবার সেই পুকুর খনন করা হচ্ছে। প্রশাসনের অভিযানের আগেই পুকুর খননকারিরা টের পেয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে সচেতনমহল উপজেলা প্রশাসনের ও থানা পুলিশের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। তারা বলছেন কেউ পুকুরখনন সিন্ডিকেটের সাথে আঁতাত করে চলছে বলেই ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযানে সাফল্য আসছে না। আবার কোনো কোনো উপজেলায় ভুক্তভোগীরা প্রশাসনের সহযোগিতাই পাচ্ছেননা বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে কয়েক বছরে পুকুরসহ অন্যান্য কারণে শুধুমাত্র এই জেলায় কৃষিজমি কমেছে প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর। পুকুরের কারনে কৃষি জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় অনাবাদি থাকছে হাজার হাজার বিঘা জমি। চাষিরা প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করেও তেমন প্রতিকার পাচ্ছেননা। রাজশাহীতে অবৈধ ভাবে পুকুর খননের পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসী আদালতের শরণাপন্ন হন। আদালত রাজশাহীর বাগমারা, পবা, গোদাগাড়ী, দুর্গাপুর ও পুঠিয়া উপজেলায় পুকুর খননের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। তারপরেও থামছেনা এই পুকুর খনন।
গত বৃহস্পতিবার রাতে গিয়ে দেখা গেছে, পবার বাগধানির পর থেকে তানোর এলাকার রাস্তার দুধারে লাইটের আলোর ছড়াছড়ি। প্রশাসনকে ম্যানেজ করে এস্কেভেটর মেশিন দিয়ে চলছে পুকুর খননের মহাউৎসব। ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করলে তিনিও এ তথ্য জানান। এরপরও দু-একটি উপজেলায় প্রশাসন পুকুর খননের বিরুদ্ধে অভিযান চালালেও লাভ হচ্ছে না। পবা উপজেলায় প্রশাসন নিয়মিতই অভিযান চালাচ্ছে। তারপরও উপজেলার বড়গাছি, দারুশা, দর্শনপাড়া এলাকায় দিনের আলোতেই পুকুর খনন চলছে।
বিশেষ করে পবা উপজেলার দারুশা হাওয়ার মোড়ে ১০০বিঘা তিন ফসলি কৃষি জমির উপর অবাধে চলছে পুকুরখনন। এই পুকুরেই তিনটি এস্কেভেটরে (মাটি খননকারি মেশিন) প্রায় ৫০টি ট্রাক্টর দিয়ে বিভিন্ন স্থানে পুকুর খননের মাটি বহন হচ্ছে। এতে ওই এলাকার গ্রামীণ রাস্তার বারোটা বেজেছে। গত শনিবার সরোজমিন গিয়ে এর শতভাগ সত্যতা মিলেছে। সেখানে পুকুরখননের ছবি তুলতেই সাত-আটজন সাংবাদিককে ঘিরে ধরে প্রশ্ন শুরু করেন। আর এই প্রশ্নগুলো করছিলেন পুকুরখননকারি মিনারুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘এই পুকুরে চারবার অভিযান হয়েছে। তাতে আমার খরচ বাড়ছে। কিন্তু খননকাজ চলছে। এই পুকুরখননে অনেকেই আমার কাছে থেকে সুবিধা নিয়েছে এবং নিচ্ছে। আপনি বোঝেন না, অভিযান চলার পরেও কিভাবে পুকুরখনন চলছে’। এছাড়াও দর্শনপাড়া ইউনিয়নের কোপাকান্দি মোড়ে চলছে অবাধে পুকুরখনন। পুকুরখনন সিন্ডিকেটের সদস্য কোপাকান্দির বাবু। কয়েকদিন আগে পবা সহকারি কমিশনার ভ‚মি আবুল হায়াত অভিযান চালিয়ে পুকুর কাটা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তবে এখন আবারো অবাধে চলছে খননকাজ।
ওই এলাকায় পুকুরখনন বিষয়ে কর্ণহার থানার অফিসার্স ইনচার্জ আনোয়ার আলী তুহিন বলেন, পুকুরখনন বন্ধের উদ্যোগ পুলিশ প্রশাসনের এখতিয়ার বহির্ভূত। রাস্তায় অবৈধ ট্রাক্টর বিষয়ে তিনি পদক্ষেপ নিবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
পবা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবুল হায়াত বলেন, পুকুর খনন কেউ করছে- এমন অভিযোগ পাওয়া গেলে অবশ্যই অভিযান চালানো হচ্ছে। এ বছর পবা উপজেলায় ৩০-৩২টি অভিযান চালানো হয়েছে। ২৫টি ড্রেজার মেশিন নস্ট করা হয়েছে। কিন্তু দু-এক দিন পর তারা আবার খনন শুরু করে। এতে সামাজিক সচেতনতা জরুরী। আগামীতে অব্যাহতভাবে মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হবে।
এদিকে একই অবস্থা চলছে জেলার অন্য উপজেলাগুলোয়। তানোরের চান্দুড়িয়া এলাকার বিলের প্রায় সিংহভাগ জমি এখন পুকুর হয়ে গেছে।
রাজশাহী কৃষি বিভাগ বলছে, কয়েক বছর ধরেই গোদাগাড়ী, পবা, তানোর, বাগমারা, দুর্গাপুর, পুঠিয়া, মোহনপুর, বাঘা ও চারঘাট এলাকায় ফসলি জমিতে পুকুর খননের মহা উৎসব চলছে। প্রতি বছরই ছোটবড় প্রায় ১ হাজার পুকুর কাটা হচ্ছে। গত আট বছরে নতুন ৫ হাজার পুকুর কাটা হয়েছে। এসব পুকুরের কারণে হাজার হাজার হেক্টর জমিতে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা।

SHARE