তফসিলের পরই চূড়ান্ত আন্দোলনে যাবে ঐক্যফ্রন্ট

159

অনলাইন ডেস্ক : আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে ৭ দফা দাবি পূরণে সরকার কোনো উদ্যোগ না নিলে ‘চূড়ান্ত আন্দোলনে’ যাবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। তবে শুরুতেই কঠোর কর্মসূচি নয়, ধাপে ধাপে হার্ডলাইনে যাবে তারা। ইতিমধ্যে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে ঘোষিত দাবির সপক্ষে বিভাগীয় শহরে শুরু হওয়া সভা-সমাবেশের ‘জনমত’ দেখে আন্দোলনের ‘চূড়ান্ত কর্মসূচি’ নির্ধারণ করবে জোটটি। কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে সিলেটে প্রথম জনসভায় জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলনে নামার আহ্বান জানিয়েছেন সরকারবিরোধী জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতারা। তবে ঐক্যফ্রন্টের হুঁশিয়ারিতে উদ্বিগ্ন নয় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দুশ্চিন্তায় নেই সরকারও। বরং এই হুঁশিয়ারিকে ‘রাজনৈতিক’ ও নির্বাচনের আগে সরকারবিরোধী পক্ষের ‘মাঠ গরম রাখার’ কৌশল হিসেবেই দেখছেন আওয়ামী লীগ ও সরকারের নীতিনির্ধারকরা। এ অবস্থায় রাজনৈতিকভাবেই বিরোধী পক্ষের সম্ভাব্য আন্দোলন মোকাবেলা করার কথাও বলছেন তারা।

জাতীয় নির্বাচনের আগে সরকারের পদত্যাগ, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠন এবং সংসদ বাতিলের দাবি নিয়ে আত্মপ্রকাশ করা নতুন জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট বুধবার সিলেটের জনসভার মাধ্যমে রাজপথের আন্দোলনে নেমেছে। যদিও ঐক্যফ্রন্টের সাত দফার প্রধান দাবিগুলোই সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে উড়িয়ে দিচ্ছে ক্ষমতাসীনরা। সরকারবিরোধী নতুন জোটের নেতারা বলছেন, তীব্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দাবি মানতে সরকারকে বাধ্য করা হবে। নির্বাচনকালীন ব্যবস্থা এবং আন্দোলন দমনে ক্ষমতাসীনদের কঠোর অবস্থানের মধ্যে এই জোট কীভাবে দাবি আদায় করবে সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

সূত্র জানায়, এ মুহূর্তে ঐক্যফ্রন্টের মূল লক্ষ্য হচ্ছে ঐক্যকে আরও শক্তিশালী ও জোরদার করা, যেভাবেই হোক ঐক্য ধরে রাখা। নিজেদের ঘোষিত ৭ দফা দাবি ও ১১ লক্ষ্যের সপক্ষে সারাদেশে জনমত তৈরি করা। সিলেটের পর আগামীকাল চট্টগ্রামে জনসভা করার কথা রয়েছে ঐক্যফ্রন্টের। এরপর রাজশাহীতে ২ নভেম্বর জনসভার কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বাকি বিভাগীয় শহরগুলোতেও জনসভা করার পরিকল্পনা রয়েছে। সব শেষে ঢাকায় জনসভা করবে ঐক্যফ্রন্ট। এর মধ্যে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণাও হয়ে যেতে পারে। তফসিল ঘোষণার আগে তাদের দাবি পূরণ না হলে ঢাকার জনসভা থেকেই ‘চূড়ান্ত আন্দোলনে’র কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করতে পারে ঐক্যফ্রন্ট।

সূত্র জানায়, ঐক্যফ্রন্টকে শক্তিশালী করতে এরই মধ্যে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট ও মহাজোটের বাইরে থাকা ছোট ছোট রাজনৈতিক দলকে জোটে টানার চেষ্টা চলছে। এ লক্ষ্যে গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে তার বেইলি রোডের বাসভবনে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর আবদুল কাদের সিদ্দিকী বৈঠক করেছেন। একইসঙ্গে কয়েকটি ইসলামী দলের সঙ্গেও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন ঐক্যফ্রন্ট নেতারা। বিশেষ করে ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে জোট নেতাদের। বাম দলগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ রক্ষা করছেন তারা।

সূত্র আরও জানায়, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই সরকার, সরকারি দল আওয়ামী লীগ ও নির্বাচন কমিশনকে ৭ দফা দাবি সংবলিত চিঠি দেওয়ার কথা বললেও সেটা কবে নাগাদ দেওয়া হবে তার দিনক্ষণ এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তবে এ বিষয়ে ‘কৌশলী’ ভূমিকা নেওয়ার আভাস পাওয়া গেছে। সরকারের মনোভাব ও সার্বিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে চিঠি দেওয়ার সময় তাৎক্ষণিকভাবেই নির্ধারণ করা হতে পারে। আবার সরকারের মনোভাব বুঝে চিঠি না দেওয়ার সিদ্ধান্তও নেওয়া হতে পারে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর  বলেন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে এরই মধ্যে তারা ৭ দফা দাবি উত্থাপন করেছেন। তারা আশা করছেন, সরকার শুভবুদ্ধির পরিচয় দিয়ে তফসিল ঘোষণার আগেই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যাপারে সংলাপের উদ্যোগ নেবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তফসিলের আগে দাবি পূরণের কোনো উদ্যোগ না নিলে দল ও জোটের ফোরামে বসে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করবেন। দেশের জনগণকে নিয়ে আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে দাবি পূরণে বাধ্য করবেন তারা। এমনকি দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে নিয়েই নির্বাচনে অংশ নেবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তারা।

সূত্র জানায়, রাজনৈতিক ‘কৌশল’ হিসেবে আপাতত দাবি পূরণের ব্যাপারে সরকারের মনোভাব দেখতে সময় নিচ্ছে ঐক্যফ্রন্ট। আরও কয়েকদিন সরকারকে সময় দেবে তারা। সরকার সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে ৭ দফা পূরণ না করে যে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় যাক না কেন- সে প্রক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জ করবে ঐক্যফ্রন্ট। বিএনপি, গণফোরাম, জেএসডি ও নাগরিক ঐক্যের সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট বিনা চ্যালেঞ্জে সরকারকে এবার একতরফা নির্বাচন করতে দেবে না।

ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শরিক ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না গতকাল  বলেন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে আমরা গণতান্ত্রিকভাবে আন্দোলন করছি। প্রয়োজনে অবরোধসহ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সব কর্মসূচিই দেব।

উদ্বেগ নেই আওয়ামী লীগে :ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন শীর্ষ নেতা বলেছেন, এ ধরনের আন্দোলনের হুমকি কয়েক বছর ধরেই দিয়ে আসছে বিএনপি ও তার মিত্ররা। তবে কার্যত কোনো আন্দোলনই তারা গড়ে তুলতে পারেনি। এই অবস্থায় বিএনপিসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট অতীতের মতো আবারও ব্যর্থ হবে। তাদের আন্দোলনের হুমকিতে উদ্বিগ্ন কিংবা ভীত হওয়ার কিছু নেই।

অবশ্য জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের এমন হুঁশিয়ারি আসার অনেক আগে থেকেই মাঠে রয়েছে আওয়ামী লীগ। চলছে নির্বাচনী গণসংযোগ। আজ শুক্রবার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ, উপদেষ্টা পরিষদ এবং সংসদীয় দলের (পার্লামেন্টারি পার্টি) যৌথসভায় ঐক্যফ্রন্টের দাবির বিষয়টি আলোচনায় আসবে বলে মনে করা হচ্ছে। সেখানে সম্ভাব্য আন্দোলন মোকাবেলার কৌশল এবং আগামী নির্বাচনী প্রস্তুতি বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখার কথা রয়েছে।

অবশ্য এর আগে থেকেই জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে স্বাগত জানিয়ে আসছেন প্রধানমন্ত্রীসহ সরকার ও দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা। একই সঙ্গে আন্দোলনের নামে আবারও অগ্নিসন্ত্রাস ও নৈরাজ্যের ষড়যন্ত্র হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণও করে আসছেন তারা।

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকার সাভারে নির্বাচনী গণসংযোগে অংশ নিয়ে নেতাকর্মীদের আবারও ঐক্যবদ্ধ ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে ‘সন্ত্রাসী পুনর্বাসন কেন্দ্র’ আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, এখানে বিএনপি ও সন্ত্রাসীদের পুনর্বাসন করেছেন ড. কামাল হোসেন। বাংলাদেশে নষ্ট রাজনীতির কাণ্ডারি এখন কামাল হোসেন।

দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ  বলেছেন, তারা যে আন্দোলনের কথা বলছেন, তা অনেক আগে থেকেই বলে আসছেন। এখন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নামে যা বলা হচ্ছে, সেটিও নতুন কিছু নয়। ফলে আওয়ামী লীগের এ নিয়ে উদ্বিগ্ন কিংবা শঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। বরং দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মী এখন সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়ে নির্বাচনের মাঠে রয়েছেন।

SHARE